না-জানাই আমাদের বর্তমানকে মূল্যবান করে তোলে


আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। সূর্য উঠেছে, পাখিরা গান গাইছে, মানুষজন কাজে যাচ্ছে - সবকিছু স্বাভাবিক। ঠিক যেমনটা স্বাভাবিক ভেবেছিলো ৬ আগস্ট, ১৯৪৫ সালের হিরোশিমার লোকজন। তাই মনে হলো, এই স্বাভাবিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে একটা অদ্ভুত সত্য - একটু পরে কী ঘটবে আমরা কিছুই জানিনা। এবং কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই হঠাত চারিদিক অন্ধকার নেমে এলো আর বৃষ্টি শুরু হলো। 


আমি অনেক পরিকল্পনা করি। আগামীকাল কী করব, আগামী সপ্তাহে কী হবে, আগামী বছর কোথায় থাকব - এসব ভাবনা আমার মনে বাসা বাঁধে। নিজেকে বলি, "আমি জানি আমার ভবিষ্যৎ কেমন হবে।" কিন্তু এটা কি সত্যি? প্রতিদিন হাজারো সিদ্ধান্ত নিই, হাজারো কাজ করি, কিন্তু পরের মুহূর্তে কী হবে তা কি আমরা জানি?

আল্লাহ্‌ পাক কুরআনে বলেছেন: "কোন প্রাণী জানে না আগামীকাল সে কী অর্জন করবে, আর কোন প্রাণী জানে না কোন স্থানে তার মৃত্যু হবে।" (সূরা লুকমান, আয়াত: ৩৪)

আপনি ধরেন একদিন বাসায় বসে পড়াশোনা করছিলেন। আপনার বাবা আপনাকে বললেন, "বাজারে যাবি? দশ মিনিটের কাজ।" আপনি রাজি হলেন। সেই দশ মিনিটের কাজে গিয়ে একজন পুরনো বন্ধুর সাথে দেখা হলো, যে আপনাকে একটা চাকরির সুযোগের কথা বলল। সেই চাকরি পেয়ে গেলেন, যা আপনার জীবনের গতিপথ বদলে দিল। একটু পরে কী ঘটবে তা আপনি কি জানতেন? না। এই অনিশ্চয়তাই জীবনকে রহস্যময় করে তোলে।

আমরা যখন বড় বড় পরিকল্পনা করি, তখন মনে করি সবকিছু আমাদের নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু এটা বলা হয়েছে, "তোমরা পরিকল্পনা করো, আল্লাহও পরিকল্পনা করেন। আর আল্লাহ সর্বোত্তম পরিকল্পনাকারী।"

একটু চিন্তা করি। আমরা কত বড় ব্যাপারে একদম অন্ধকারে আছি তার একটা লিস্ট করি:

- আমরা জানি না কখন আমাদের শেষ নিঃশ্বাস হবে।

- জানি না কোন সিদ্ধান্ত আমাদের জীবন বদলে দেবে।

- জানি না কোন কথা কাউকে আঘাত করবে বা কাউকে অনুপ্রাণিত করবে।

- জানি না কোন কাজ দুনিয়াতে আমাদের জন্য চলমান সওয়াব হয়ে যাবে।

এই অজানাকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। বরং এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আশার আলো। কারণ যেখানে অনিশ্চয়তা, সেখানে সম্ভাবনাও অসীম।

ক্লাস নাইনে থাকতে আমি চেয়েছিলাম সায়েন্সে পড়তে। কিন্তু ফার্স্ট টার্মের এক্সামে ফিজিক্স আর কেমিস্ট্রি দুই সাবজেক্টে ফেইল করি। মাহফুজ স্যার বললেন "তুমি আর্টসে পড়ো, এটাই তোমার জন্যে ভালো।" আমি নিজেকে খুব ব্যর্থ মনে করছিলাম। মনে হচ্ছিল সব শেষ। কিন্তু সেই একটি ডিসিশন আমার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিল। এসএসসি, এইচএসসি দুইটাতেই গোল্ডেন তো পেলাম ই, সাথে বোর্ড স্কলারশিপ। তারপর "খ" ইউনিটে পরীক্ষা দিয়ে ঢাকা ইউনিভার্সিটি। আর সেদিন যদি সায়েন্সে পড়তাম, জানিনা আজকে আমি কোথায় থাকতাম, অথবা পাশ করতে পারতাম কিনা জানিনা। 

অনিশ্চয়তাকে গ্রহণ করা সবচেয়ে বড় প্রজ্ঞা। প্রতিদিন আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা নিয়ে চলি। পরিকল্পনা করি, চেষ্টা করি, কিন্তু জানি - শেষ পর্যন্ত সব কিছু আল্লাহর হাতে।

আপনি যখন জানেন যে পরবর্তী মুহূর্তে কী ঘটবে তা আপনার অজানা, তখন প্রতিটি মুহূর্তের মূল্য বেড়ে যায়। আজ যে বন্ধুকে দেখছেন, কাল হয়তো দেখবেন না। কিছুদিন আগেও ইফতেখার তামিম আমার পাশে বসে অফিস করতো। একদম সুস্থ মানুষ। কিন্তু ঈদের দিন থেকে হঠাত অসুস্থ, পরের দিন আইসিইউ, সেই সপ্তাহের শুক্রবারে আল্লাহর জিম্মায় চলে গেলেন। তাই আজ যে সুযোগ পেয়েছেন, কাল হয়তো থাকবে না। 

মাঝে মাঝে ভাবি, যদি আমি জানতাম আগামীকাল কী ঘটবে, তাহলে কি আজকে এভাবেই কাটাতাম? হয়তো না। এটা নিয়ে আমি একটু চিন্তা করছিলাম। চিন্তা করতে করতে হঠাত ভাবলাম, আমরা যখন কোনো বই পড়তে বসি, শুরুতেই কি আমরা শেষের অধ্যায়ে গিয়ে দেখি লাস্টে কী ঘটবে? অথবা একটা মুভি দেখছেন, শুরুতেই টেনে লাস্টে গিয়ে দেখলেন শেষে কী ঘটে, এমন কি কখনো করেন? কখনই না। এখানে ক্ষমতা থাকলেও আমরা তা দেখতে চাইনা। কারণ মানুষ হিসেবে আমরা থ্রিল পছন্দ করি। এই না-জানাই আমাদের বর্তমানকে মূল্যবান করে তোলে।

Previous Post Next Post