আমরা প্রতিদিন কত খবর পড়ি, কত পোস্ট দেখি, কত ভিডিও দেখি... অথচ সত্যিকারের কোনো কিছুই হৃদয়ে ঠাঁই পায় না। আমরা যেন এক পাত্রে পানি ঢালছি, আর তলার ফুটো দিয়ে সব বেরিয়ে যাচ্ছে। এই যে তথ্যের বন্যা- এটা আমাদের মনটাকে ক্লান্ত করে, হৃদয়টাকে শূন্য করে দেয়।
তুমি যদি প্রতিদিন শত শত খবর পড়ো, কিন্তু একটাও তোমার জীবনকে বদলাতে না পারে, তাহলে সেই জ্ঞান, সেই খবর আসলে কী কাজে লাগবে?
আর সোশ্যাল মিডিয়ার কথা বলি- ওখানে যেসব খবর আসে, সেগুলো কি আসলেই তুমি চেয়েছিলে জানতে? না কি অ্যালগরিদম তোমাকে ঠেলে দিয়েছে, তুমি নিজেও জানো না কোন দিকে?
অ্যালগরিদমের খেলায় আমরা পুতুল হয়ে গেছি। তারা আমাদের সামনে যা রাখে, আমরা তা-ই দেখি, তা-ই ভাবি। অথচ আমাদের উচিত ছিল, আমরা নিজেরা ঠিক করবো কী জানবো, কী জানবো না। এটা ঈমানেরও এক অংশ- নিজের মস্তিষ্কের মালিক হওয়া, তাকে বিক্রি করে না দেয়া।
আজকের তথ্য সংস্কৃতি আমাদের সেই গভীর চিন্তার সুযোগ কতটুকু দেয়? আমরা হয়ে উঠছি তথ্যের ভোক্তা মাত্র, জ্ঞানের অন্বেষক নয়।
সোশ্যাল মিডিয়া আলগরিদম আমাদের জন্য নির্বাচন করে কোন খবর আমরা দেখব, কোন মতামত আমাদের কাছে পৌঁছাবে। এই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় লক্ষ্য থাকে আমাদের মনোযোগ ধরে রাখা, আমাদের বেশি সময় স্ক্রিনের সামনে আটকে রাখা। কখনো ভেবে দেখেছ, যে খবরগুলো আমরা দেখি, তার কতটুকু আসলেই আমাদের জীবনের জন্য প্রয়োজনীয়?
যে জ্ঞান তোমার আচরণকে বদলায় না, সেটা জ্ঞান নয়, তথ্য মাত্র। অনেকে বলে তারা নাকি জ্ঞান অর্জনের জন্যে ফেসবুক ব্যবহার করে। আমরা প্রতিদিন কত তথ্য গ্রহণ করি, কিন্তু তার কতটুকু আমাদের জীবনে প্রকৃত পরিবর্তন আনে?
তথ্যের মানের বিষয়টি ভাবনার যোগ্য। গুণগত তথ্য আমাদের বিবেচনাশীল করে, প্রশ্ন করতে শেখায়, নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে ভাবতে উৎসাহিত করে। পক্ষান্তরে, নিম্নমানের তথ্য আমাদের চিন্তাকে সংকুচিত করে, আমাদের মনের খোলা জানালাগুলো বন্ধ করে দেয়।
ইমাম গাজ্জালী (রহ.) তাঁর "ইহইয়া উলুমিদ্দীন" গ্রন্থে বলেছেন, জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আত্মার পরিশুদ্ধি এবং আল্লাহর নৈকট্য লাভ। কিন্তু আমাদের আজকের তথ্য গ্রহণের প্রক্রিয়া কি সেই উদ্দেশ্যের দিকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে?
একদিন সকালে উঠে সোশ্যাল মিডিয়া না দেখে, একটি বই পড়তে বসো অথবা প্রকৃতির মাঝে কিছু সময় কাটাও। দেখবে তোমার মনের অবস্থা কতটা ভিন্ন! মন হয়ে উঠবে শান্ত, স্থির, গভীর। চিন্তার গতি পরিবর্তিত হবে - ছোট ছোট চিন্তার ঝলক থেকে দীর্ঘ, গভীর চিন্তাধারায় রূপান্তরিত হবে।
আমি বলছি না যে সমস্ত তথ্য প্রযুক্তি পরিহার করতে হবে। বরং আমাদের দরকার একটি সচেতন সম্পর্ক তথ্যের সাথে। আমরা কোথা থেকে তথ্য নিচ্ছি, কেন নিচ্ছি, এবং তা আমাদের কীভাবে প্রভাবিত করছে - এই প্রশ্নগুলো নিজেকে করুন।
তথ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে একটি নীতি অনুসরণ করতে পারো: পরিমাণের চেয়ে মান বেশি গুরুত্বপূর্ণ। অল্প কিছু উচ্চমানের তথ্য আমাদের জীবনকে সমৃদ্ধ করে, যেখানে অসংখ্য তুচ্ছ তথ্য আমাদের মানসিক শক্তি ক্ষয় করে।
রুমী বলেছেন, "তোমার মধ্যে একটি সমুদ্র লুকিয়ে আছে। ডুব দাও।" বাহ্যিক দুনিয়ার অসংখ্য তথ্যের বন্যায় ভাসার বদলে, আমাদের অন্তরের গভীরে ডুব দেয়ার সময় ও সুযোগ নেওয়া দরকার। সেখানে অনেক অমূল্য জ্ঞান ও প্রজ্ঞা অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য।
আমরা মনকে কীভাবে প্রশিক্ষিত করি, কোন ধরনের তথ্য গ্রহণ করি, তা দিয়েই গড়ে উঠে আমাদের চিন্তাধারা, আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, এবং শেষ পর্যন্ত আমাদের জীবনের মান।
