এক রেসিং কার চালক, মারিও আন্দ্রেত্তি, একবার বলেছিলেন, "যদি তুমি ভাবো সবকিছু তোমার নিয়ন্ত্রণে আছে, তার মানে তুমি যথেষ্ট দ্রুত যাচ্ছো না।" আমরা অনেকেই জীবনটাকে নিজেদের মুঠোয় রাখতে চাই, সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতে চাই। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ আসলে আমাদের মনের তৈরি এক মায়া। আমরা আসলে এক বয়ে চলা নদীকে ছবিতে বন্দী করতে চাই, যা সবসময় গতিশীল।
একটা ভালো খবর আর একটা খারাপ খবর আছে। খারাপ খবরটা হলো, তুমি যেন শূন্যে ভেসে চলেছ, ধরার মতো কিছু নেই, প্যারাসুটও নেই। আর ভালো খবর? আসলে নীচে কোনও মাটিই নেই! এই কথাটা হয়তো তুমি সারা জীবন ধরেই অনুভব করেছ, কিন্তু ধরতে পারোনি।
আমরা আসলে 'এখানে' আর 'ওখানে'-র ধারণায় এতটাই অভ্যস্ত যে, জীবনটাকে একটা দৌড় প্রতিযোগিতা মনে হয়। এক বিন্দু থেকে আর এক বিন্দুতে ছুটে চলা, এক মুহূর্তের সাথে পরের মুহূর্তের তুলনা করা, যেন আমরা সবসময় কিছু একটা থেকে অন্য কিছুর দিকে এগিয়ে চলেছি। উন্নতি করছি। কিন্তু এগুলো সবই যেন ওপর-ওপরের কথা।
নিজের ভেতরের শহরতলিতে আর কতদিন? আসল কেন্দ্রটা তো বাইরে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না, কোনও উঁচু পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বা কোনও গভীর নদী পার হয়ে নয়। এটা তোমার ভেতরের সেই স্থির বিন্দু, সেই সচেতনতা যা সবসময় ছিল, আছে। কেন্দ্র মানে কম্পাসের কাঁটা বা বৃত্তের মাঝখানের বিন্দু নয়। যখন আমরা 'এখানে'-কে কেন্দ্র ভাবি, তখন আমরা কোনও নির্দিষ্ট স্থান বা পরিমাপযোগ্য বিন্দুর কথা বলি না। কেন্দ্র আসলে এমন কিছু নয় যা তুমি ঘুরে ঘুরে বা ম্যাপে খুঁজে পাবে। অসীমের বৃত্তে কেন্দ্র কোথায়? যেখানে তুমি আছো, সেটাই কেন্দ্র। আবার, কেন্দ্র সর্বত্রই। এর কোনও নির্দিষ্ট সীমানা নেই।
জীবনের পথে চলতে গিয়ে আমরা দু'রকম অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হতে পারি যা 'আমি'-র এই নির্দিষ্ট কেন্দ্রের ধারণাকে নাড়িয়ে দেয়। এক, গভীর মানসিক আঘাত বা ট্রমা। তখন মনে হয়, শরীরটা এখানে থাকলেও মনটা যেন অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে। স্মৃতিগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যায়, নিজের পরিচিতিটাই যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। এই অবস্থায় নিজেকে আবার খুঁজে পাওয়া, সেই ভেতরের কেন্দ্রে ফিরে আসাটাই নিরাময়ের পথ।
অন্যদিকে, মিস্টিকরা ঠিক এর উল্টো অভিজ্ঞতার কথা বলেন। সেখানে 'আমি'-র ক্ষুদ্র গণ্ডিটা ভেঙে যায়, কিন্তু সেটা হারানোর বেদনা নয়, বরং এক বিশাল প্রসারের আনন্দ। তখন মনে হয়, "আমিই ছিলাম গাছ, আমিই আকাশ। আমি কিছুই ছিলাম না, আবার আমিই সব ছিলাম।" এর মানে হলো, 'আমি'-র ধারণাটা আলগা হয়ে গেছে, আর সচেতনতা তার অসীম ক্ষেত্রে ফিরে গেছে।
কোয়ান্টাম ফিজিক্সের 'নন-লোকালিটি'-র ধারণাটাও অনেকটা এমনই। এর মানে হলো, বস্তুগুলো কোনও একটি নির্দিষ্ট স্থানে আবদ্ধ নয়। তুমি নড়াচড়া না করেও যেন সর্বত্র থাকতে পারো। আসলে মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা একে অপরের সাথে এমনভাবে যুক্ত যে, কোনও নির্দিষ্ট 'এখানে' বা 'সেখানে' নেই।
একটা ছোট্ট অনুশীলন করতে পারো। এক ঘণ্টার জন্য বাস্তবতাকে দুটো ভিন্ন চোখে দেখার চেষ্টা করো। একদিকে দেখবে ছোট ছোট ঘটনা, ব্যক্তি, বস্তু, যা কিছু আলাদা আলাদা, নির্দিষ্ট। অন্যদিকে, দেখবে সবকিছু মিলিয়ে এক অখণ্ড সত্তা, যেখানে কোনও বিভেদ নেই, সবকিছুই পরস্পরের সাথে জড়িত। দেখবে, এই দুটো দৃষ্টিই একইসাথে সত্যি।
তাত্ত্বিকভাবে, আমাদের পুরো মহাবিশ্বটাই হয়তো একটা হলোগ্রাম, একটা দ্বিমাত্রিক তল থেকে তৈরি হওয়া ত্রিমাত্রিক ছবি। এর মানে, আমরা এখানে আছি আমাদের শরীরে, কিন্তু বৃহত্তর অর্থে আমরা সর্বত্রই। তোমার অভিজ্ঞতার কেন্দ্র আর তোমার সচেতনতার পরিধির মধ্যেকার বিভেদটা আসলে এক বিভ্রান্তি।
আমরা আমাদের চিন্তাভাবনা দিয়ে নিজেদের গড়ি, আবার সেই চিন্তাভাবনাই আমাদের গড়ে তোলে। এই 'এখানে' আর 'সেখানে'-র চিন্তাগুলো আসলে দ্বৈত পৃথিবীর দরজা খুলে দেয়। কিন্তু সত্যিকারের উপলব্ধি হয়তো এই দ্বৈততার ঊর্ধ্বে, যেখানে সবকিছুই একাকার। সেই উপলব্ধিই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় রোমাঞ্চ, সবচেয়ে গভীর প্রশান্তি। আর এই উপলব্ধি একবার হলে, নিয়ন্ত্রণের মায়াটা আপনিই কেটে যায়, আর তুমি জীবনের অনন্ত প্রবাহে ভেসে চলো- দ্রুত, আরও দ্রুত।
