ধরুন, আপনি দেখছেন সাদাকালোয় আঁকা এক মহাকাব্য। পর্দা জুড়ে আলো-আঁধারির খেলা, যেন কোনও শিল্পীর খেয়ালে তুলির আঁচড় পড়ছে। কখনও মনে হচ্ছে মহাবিশ্বের জন্মলগ্ন, আবার কখনওবা মায়ের গর্ভে ভ্রূণের প্রথম স্পন্দন। এই যে শুরুটা, এটাই তো জীবনের প্রথম ধাক্কা, প্রথম কৌতূহল- "কী আছে ওপারে?"
হঠাৎ যেন এক বিস্ফোরণ, আলো আর আঁধারের খেলা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। ভেঙেচুরে ছড়িয়ে পড়ছে কতকিছু! মনে হচ্ছে না, আমাদের জীবনের শুরুটাও তো এমনই? একটা চেনা জগৎ থেকে হঠাৎ করে বেরিয়ে আসা, নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা। ভাঙনের মধ্যেই তো সৃষ্টির বীজ লুকিয়ে থাকে। পুরনো ধারণা ভাঙে, নতুন বিশ্বাস জন্মায়। কাঁচের টুকরোগুলোর মতো আমাদের অভিজ্ঞতাগুলোও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে, কিন্তু সেগুলো জুড়েই তো তৈরি হয় আমাদের নিজস্ব পৃথিবীর প্রতিচ্ছবি।
দৃশ্যপট বদলায়। গোলকগুলো যেন একেকটা ছোট্ট ব্রহ্মাণ্ড, আবার কখনওবা ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র পরমাণু। আলো ঠিকরে পড়ছে তাদের গা থেকে, যেন অনন্ত নক্ষত্রবীথি। এই দেখে মনে হয়, আমরা কতটা বিশাল এক জগতের অংশ, আবার নিজেরাও একেকজন স্বতন্ত্র সত্তা। এই যে স্কেলের তারতম্য- কখনও নিজেকে খুব বড় মনে হওয়া, আবার পরক্ষণেই এই অনন্ত মহাবিশ্বের তুলনায় ধূলিকণার মতো তুচ্ছ লাগা- এটাই তো জীবনের এক অদ্ভুত দোটানা!
কখনও প্রকৃতির রুদ্ররূপ- বিদ্যুতের ঝলকানি, মেঘের গর্জন। আবার কখনও শান্ত চাঁদ, তারাদের মিটিমিটি আলো, ধীরেসুস্থে বয়ে চলা নদী। অন্যদিকে শহরের স্কাইলাইন, জালের মতো বিছানো সংযোগ, প্রযুক্তির দ্রুতগতি। প্রকৃতি আর মানুষের তৈরি জগতের এই সহাবস্থান আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়- সবকিছুর মধ্যেই একটা ছন্দ আছে, একটা নকশা আছে। এই নকশা খুঁজে বের করাই তো জ্ঞান, আর সেই ছন্দে তাল মেলানোই তো প্রজ্ঞা।
দৃশ্য এগিয়ে চলে। আমরা দেখি গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা- যেন কোনও শিল্পী পরম যত্নে এঁকেছেন এই বিশাল ক্যানভাস। আবার দেখি পৃথিবীর বুকে আঁকা মানুষের পায়ের ছাপ, প্রাচীন কোনও সভ্যতার নকশা, কিংবা আধুনিক স্থাপত্যের জটিল বিন্যাস। সবকিছুই যেন একটা অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ- সব মিলেমিশে একাকার।
আর এরই মাঝে এক ছায়ামূর্তি হেঁটে চলেছে অনন্তের পথে। সে কি আপনি? আমি? নাকি আমাদের সম্মিলিত মানবসত্তা? এই পথচলাতেই আনন্দ, এই পথচলাতেই জীবনের সার্থকতা। গন্তব্য হয়তো অজানাই থেকে যাবে, কিন্তু প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি বাঁক আমাদের নতুন কিছু শেখায়, নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে।
