কি সুন্দর! আমি এখনো বেঁচে আছি। শরীরে কোনো অসুখ বিসুখ নেই বললেই চলে। শরীরে তেমন কোনো ব্যথা নেই, জীবনের ভার ততটাও ক্লান্ত করেনি। আমি এখনো পৃথিবীর আলো হাওয়ায় হাঁটছি, এই রঙিন গ্রহটা আমার জন্য এখনো খোলা। আমি এখনো এই পৃথিবীতে আছি। পৃথিবীটাকে পুরো দেখা হয়নি। পৃথিবীটা অনেক সুন্দর। কিন্তু তার সৌন্দর্য্য আর কতখানিই বা দেখেছি। আমি জানি পৃথিবীর অনেক জায়গা আছে যেগুলো অনেক সুন্দর। কিন্তু সেখানে যাওয়া তো আর কয়েক সেকেন্ডের ব্যাপার না।
মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হয়েও এক দেশ থেকে আরেক দেশে মুহূর্তেই যেতে পারেনা। কিন্তু একটা পাখি ডানা মেলে বহুদূর পাড়ি দিতে পারে। মানুষের যদি ডানা থাকতো, তাহলে কি মানুষ কাজকর্ম রেখে শুধু ঘুরে বেড়াতো? তখন কি ভিসা পাসপোর্টের প্রয়োজন থাকতো? এখনকার মানুষের আকৃতির সাথে ডানা যুক্ত করলে একটু বেখাপ্পা লাগতো যদিও। ধরো আমরা আকারে অনেক ছোট এবং আমাদের ডানা আছে। তাহলে কি আমরা সারাদিন ঘুরে বেড়াতাম? আকাশে অনেক পাখি উড়ে বেড়ায়। তাঁদের দেখে মনে হয় তারা কোনো কাজ করছেনা, শুধুই উড়ে বেড়াচ্ছে। এভাবে উড়তে উড়তে কি একসময় বোরিং লাগে? যেমন আজকের দিনের শেষে মানুষ ক্লান্ত হয়, পাখিরাও কি দিনের শেষে ক্লান্ত ডানা গুটিয়ে কোনো ডালে বসে ভাবে- "আজ আর কিছুই ভালো লাগছে না"। সুন্দর জায়গা দেখতে দেখতে একসময় কি আর নতুন কিছু অবশিষ্ট থাকে? নাকি তখন সবই ঘুরেফিরে একইরকম লাগে? এক পাহাড়, এক নদী, এক গাছ...
মানুষের চিন্তা হয়তো এখানেই ভিন্ন। সে শুধু দেখেই না, দেখতে গিয়ে ভাবেও। সে শুধু ঘুরেই না, ঘুরে এসে গল্প বানায়, স্মৃতি গড়ে। মানুষের কাছে সৌন্দর্য দেখা মানে কেবল চোখে দেখা নয়- তাতে থাকে এক ধরণের ব্যাখ্যা, এক ধরণের অনুভব। তবে মানুষ সব দেখেও পুরোটা বুঝতে পারে না, বরং প্রতিটা দৃশ্য তাকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। একই নদী বারবার দেখলেও তার রঙ, তার শব্দ, তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছটাও যেন প্রতিবার নতুন কিছু বলে। মানুষ তার দেখার ভেতরেই অর্থ খোঁজে, সে মুহূর্তকে ধরে রাখতে চায়, তার মধ্যে নিজেকে খুঁজে পায়। এ কারণেই মানুষ কেবল পর্যটক নয়, সে এক ধরনের সাধক, যে প্রতিটি দৃশ্যের মধ্যে জীবনের কোনো গভীর ইশারা খোঁজে।
যদি মানুষের ডানা থাকতো, তাহলে হয়তো সে আরও বেশি জায়গায় যেতে পারতো, কিন্তু সেই দেখার গভীরতা কি বাড়তো? নাকি তখন সে দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে যেত? মানুষের সীমাবদ্ধতা তাকে গভীরতা দেয়- কারণ সে সব জায়গায় যেতে না পারলেও, কিছু জায়গাকে ভেতর দিয়ে অনুভব করতে শেখে।
তাই হয়তো পৃথিবীটা এত সুন্দর, কারণ আমাদের তাকে ধীরে ধীরে জানতে হয়। যদি এক মুহূর্তেই সব দেখা যেত, তাহলে হয়তো কোনো কিছুই আর বিশেষ মনে হতো না। সীমাবদ্ধতা কখনো কখনো সৌন্দর্যের প্রয়োজনীয় শর্ত হয়ে ওঠে।
