আবার যদি এক উম্মাহ হই


আদিতে মানুষ ছিল এক উম্মাহ- এক বিশ্বাসে, এক আদর্শে ঐক্যবদ্ধ। আদম (আ.)-এর সন্তানরা একটি সৎ ও সরল জীবনের পথেই চলছিল। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই ঐক্যের সুর ছিঁড়ে গেলো। শয়তানের কুমন্ত্রণা, নাফসের কামনা, আর মানুষের সীমাহীন লোভ ঢেকে দিল মানবতার আকাশ। যে জায়গায় ছিল ভালোবাসা ও সহমর্মিতা, সেখানে দানা বাঁধলো স্বার্থপরতা, ক্ষমতার লালসা, আর হিংসা।

আজকের বিশ্বে তাকালেই দেখি- বিভাজন, সংঘর্ষ, যুদ্ধ আর অস্থিরতার ছায়া। জাতিগত ঘৃণা, রাজনৈতিক বিভক্তি, ধনী-গরিবের অসহনীয় বৈষম্য- এগুলো কি মানুষের প্রকৃত স্বভাব? নাকি আমরা ভুলে গেছি আমাদের আদি পরিচয়? আমরা কি মায়ার জালে এতটাই আবদ্ধ হয়ে পড়েছি যে, পরম স্রষ্টার প্রতি আমাদের দায়িত্বই বিস্মৃত হয়েছি?

এই বিভ্রান্তির মাঝেই ইসলাম এসেছে আলোর দিশা নিয়ে- পথহারা মানবতার জন্য করুণা ও ন্যায়ের এক উজ্জ্বল বাতিঘর হয়ে। ইসলাম আমাদের শেখায় সত্যের জন্য দাঁড়াতে, ন্যায়ের পক্ষে কথা বলতে, ভালোবাসা ও ধৈর্যের সঙ্গে মানুষকে আপন করে নিতে। কিন্তু প্রশ্ন হলো- এই বিচ্ছিন্ন, শীতল সমাজে আমরা কিভাবে ইসলামের উষ্ণতা ছড়িয়ে দেব?

ইতিহাসে আমরা দেখেছি- ইসলামের বিস্তার হয়েছিল শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নয়, বরং ন্যায়বিচার, করুণা ও প্রেমের ছোঁয়ায়। নবী মুহাম্মদ (সা.) যখন তায়েফে অপমানিত হলেন, তখন তিনি বদলা নেননি; বরং প্রার্থনা করেছিলেন তাদের হেদায়েতের জন্য। যখন তিনি বিজয়ীরূপে মক্কায় প্রবেশ করেন, ক্ষমার এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন শত্রুদের প্রতিও। এভাবেই ইসলামের বীজ হৃদয়ে হৃদয়ে রোপিত হয়েছিল।

আজ আমাদের দায়িত্ব সেই আদর্শের পুনরুজ্জীবন। প্রতিটি মানুষের জীবনে ইসলামকে পৌঁছে দিতে হবে হৃদয়ের ভাষায়, আচরণের মাধ্যমে। দাওয়াহ মানে শুধুই ভাষণ নয়; তা এক জীবন্ত দৃষ্টান্ত- যেখানে একজন মুসলিমের চরিত্র, ন্যায়পরায়ণতা, ও সহানুভূতি সাক্ষ্য দেবে তার বিশ্বাসের।

ইসলাম কখনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার ধর্ম নয়। বরং তার সৌন্দর্য ফুটে ওঠে যখন মানুষ দেখে- একটি জীবনব্যবস্থা কীভাবে ন্যায়বিচার, সমতা ও মানবতার শিখরে পৌঁছে দিতে পারে।

যেদিন আবার ইসলাম নিজের আসল রূপে মানুষের সামনে আসবে, সেদিন মানুষ নিজ থেকেই এর ছায়াতলে আশ্রয় নেবে। অন্ধকারের বিপরীতে তারা আলোর রশ্মি দেখতে পাবে; অন্যায়ের বিপরীতে ন্যায়ের দৃঢ়তা টের পাবে। হয়তো তখন আবার মানুষ হবে এক উম্মাহ- এক বিশ্বাসে ঐক্যবদ্ধ। হয়তো তখন এই শীতার্ত পৃথিবী আবার ভরে উঠবে উষ্ণতা ও জীবনের স্পন্দনে।

আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে পারে আজ, এই মুহূর্ত থেকেই- তোমার ভেতর দিয়ে, আমার মধ্য দিয়ে, আমাদের জীবন ও বিশ্বাসের মাধ্যমে।
Previous Post Next Post