আমরা কেন আছি? কেন এই অস্তিত্ব? এই প্রশ্নটা বাতাসের মতো- না দেখা যায়, না ধরা যায়; শুধু অনুভব করা যায়। নিজের ভেতর, গভীর নীরবতার ভেতর, যখন একা বসে ভাবি- এই অনন্ত নক্ষত্রবহুল মহাশূন্যে আমার এই ক্ষুদ্র, তুচ্ছ অস্তিত্বটা কেন? কেন আমি নেই হয়ে যাইনি? কেন আমি আছি?
দার্শনিকেরা যুগে যুগে মাথা কুটেছেন এর উত্তর খুঁজতে। কেউ বলেছেন, এ এক মহাজাগতিক দুর্ঘটনা, এলোমেলো কাকতাল। কেউ বলেছেন, প্রকৃতির নিয়মের পরিণতি। কিন্তু যখন মনটা নিঃশব্দ হয়ে আসে, আর আমরা ভেতরের সেই সূক্ষ্ম স্তব্ধতায় কান পাতি- তখন মনে হয়, এই সুন্দর, জটিল, পরিপাটি সৃষ্টি এলোমেলো হতে পারে না। এমনি এমনিই সবকিছু এমন নিখুঁত হয় না।
আমাদের বিশ্বাসের শিকড় যেখানে, সেখানেই এই প্রশ্নের সবচেয়ে সরল, গভীর, আর শান্তিকর উত্তরটা পাওয়া যায়: আমরা আছি, কারণ আল্লাহ চেয়েছেন আমরা থাকি।
তিনি আল-খালিক- মহান স্রষ্টা। তিনি যখন চান কিছু হোক, তিনি শুধু বলেন, “হও (কুন),” আর তা হয়ে যায় (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৮২)। আমাদের অস্তিত্ব তাঁর সেই সৃষ্টিশীল ইচ্ছারই এক ঝলক, এক প্রকাশ।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- তিনি কেন চাইলেন? তিনি তো অমুখাপেক্ষী। তাঁর তো কিছুই দরকার নেই।
ভাবো তো এক মহাশিল্পীর কথা, যার ভেতরে সৃষ্টির এক অফুরন্ত আকাঙ্ক্ষা জেগে থাকে। সে ছবি আঁকে, সুর তোলে- কেন? তার ভেতরের সৌন্দর্য, মমতা আর কল্পনার রূপ ফুটিয়ে তুলতে। আল্লাহর গুণাবলী- জ্ঞান, প্রজ্ঞা, দয়া, সৌন্দর্য, করুণা- এগুলো অসীম। এই সৃষ্টিজগৎ আর আমরা, এই সবই সেই গুণাবলীর প্রতিফলন। একেকটা আয়না।
তিনি নিজেকে প্রকাশ করতে ভালোবাসেন। তিনি চান, আমরা যেন তাঁকে চিনতে পারি, বুঝতে পারি, ভালোবাসতে পারি।
এক হাদীসে কুদসিতে তিনি বলেন:
“আমি ছিলাম এক গুপ্ত ভাণ্ডার। আমি চাইলাম পরিচিত হতে, তাই আমি সৃষ্টি করলাম।”
তিনি এমন এক সৃষ্টি চেয়েছেন, যার আছে চিন্তাশক্তি, ইচ্ছাশক্তি- যে বাধ্য হয়ে নয়, ভালোবেসে তাঁকে চিনবে, ফিরবে তাঁর দিকে। আমাদের স্বাধীন ইচ্ছাই আমাদের অস্তিত্বের মূল অর্থ- এই স্বাধীনতাই আমাদের প্রেম, আমাদের তওবা, আমাদের কৃতজ্ঞতা মূল্যবান করে তোলে।
তিনি আর-রাহমান- অসীম করুণাময়। তাঁর করুণা বর্ষণের জন্য তো পাত্র দরকার, তাই না? আমরা সেই পাত্র, আমরা সেই অস্তিত্ব, যার মাঝে তিনি করুণার স্রোত বইয়ে দেন। আমাদের সৃষ্টি, আমাদের এখানে থাকা- সবই তাঁর ভালোবাসার নিদর্শন।
এই দুনিয়াটা একটা পরীক্ষাকেন্দ্র। কে কৃতজ্ঞ আর কে অকৃতজ্ঞ, কে ন্যায় করে আর কে অবিচার- এই সব যাচাইয়ের ময়দান এই জীবন। এই পরীক্ষা গ্রহণের জন্যই তো পরীক্ষার্থী দরকার।
আমাদের প্রত্যেকটি চিন্তা, প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি কাজ একেকটা পদক্ষেপ এই পরীক্ষায়।
তিনি আমাদের পাঠিয়েছেন পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হয়ে। তাঁর জ্ঞান, বিবেক ও ন্যায়ের বীজ দিয়ে তিনি আমাদের প্রস্তুত করেছেন- এই পৃথিবীতে সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য, তাঁর সৃষ্টির যত্ন নেওয়ার জন্য, আর এই ক্ষণিক সময়টুকুতে কিছু অনন্ত মূল্য অর্জনের জন্য।
তাহলে দেখো- আমাদের আসাটা কোনো কাকতাল নয়। এটা এক মহান পরিকল্পনার অংশ। আমাদের সৃষ্টি এক মহাবিস্ময়, এক গভীর ভালোবাসা ও করুণার প্রতিচ্ছবি।
আমরা হয়তো এই মুহূর্তে সব বুঝতে পারি না, যেমন একটা পিঁপড়া বুঝে না পুরো বনজগতের মানে। কিন্তু আমরা জানি, আমাদের এখানে থাকাটা অর্থহীন নয়।
আমরা আছি, কারণ এক মহান সত্তা ভালোবেসে আমাদের চেয়েছেন। আমরা আছি, যেন তাঁকে জানতে পারি, ভালোবাসতে পারি। আমরা আছি, যেন তাঁর গুণাবলী ধারণ করে এই দুনিয়ায় আলোর একটি রেখা হয়ে উঠতে পারি।
আমরা আছি, যেন এই ক্ষণস্থায়ী পরীক্ষার শেষে চিরস্থায়ী ঠিকানায় ফিরতে পারি- সেই সত্তার কাছেই, যাঁর ভালোবাসা থেকে আমাদের অস্তিত্বের সূচনা।
