আগের দিনের মানুষের চেয়ে আমাদের জীবন এখন কত সহজ! কাপড় ধোয়ার জন্য মেশিন, বাসন মাজার জন্য মেশিন, গরমে ঠান্ডা থাকার ব্যবস্থা, শীতে গরম থাকার ব্যবস্থা। দূরে যাওয়ার জন্য গাড়ি, উড়োজাহাজ। শারীরিকভাবে আমাদের খাটুনি তো অনেক কমে গেছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের মতো শিকার করতে দৌড়াতে হয় না, বা চাষের জন্য দিনরাত জমিতে পড়ে থাকতে হয় না। তাহলে? এত সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার পরেও আমরা কেন আরও বেশি ক্লান্ত? ঘুম থেকে উঠেও যেন মনে হয় ঘুমটা পুরো হয়নি। বিকেল গড়ালেই শরীর আর চলতে চায় না।
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে কিছু জিনিস পড়ে, কিছু ভাবনা মাথায় এল। ভাবলাম, আপনাদের সাথে শেয়ার করি। এটা কোনো ডাক্তারি পরামর্শ নয়, শুধুই কিছু চিন্তা…
বিষয়টা বুঝতে হলে আমাদের একটু পেছনে ফিরে তাকাতে হবে। ধরুন, কয়েক লক্ষ বছর আগের কথা। আমাদের পূর্বপুরুষ, আদিম মানুষ। তাদের শরীর আর আমাদের শরীর কিন্তু মৌলিকভাবে একই রকম। বিশেষ করে আমাদের মস্তিষ্ক। কিন্তু তাদের জীবনযাত্রা আর আমাদের জীবনযাত্রা? আকাশ-পাতাল তফাৎ!
সকালে ঘুম থেকে উঠে আদিম মানুষটির হয়তো হাতে গোনা কয়েকটা সিদ্ধান্ত নিতে হতো। আজ পানি কোথা থেকে আনবে? শিকারে যাবে নাকি ফলমূল কুড়াবে? এই মাশরুমটা কি খাওয়া নিরাপদ? দিনের বেশিরভাগ সময় হয়তো তারা নিজেদের গুহায় বা আস্তানায় বিশ্রাম নিত, গল্প করত, আগুন জ্বালানোর জন্য কাঠ সংগ্রহ করত। তাদের মস্তিষ্ক অবশ্যই কাজ করত, কিন্তু আজকের দিনের তুলনায় সিদ্ধান্তের বোঝাটা ছিল অনেক কম।
এবার ভাবুন বিংশ শতাব্দীর কথা। শিল্প বিপ্লবের পর। মানুষ কারখানায় কাজ করছে, একটা নির্দিষ্ট রুটিনে বাঁধা জীবন। সিদ্ধান্তের সংখ্যা হয়তো কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু সেটাও আজকের তুলনায় কিছুই না।
আর এখন? আমরা, এই ২০২৫ সালে? সকাল বেলা ঘুম থেকে ওঠার পর থেকেই শুরু হয়ে যায় সিদ্ধান্তের ঝড়! ফোনটা কোথায়? অ্যালার্ম বন্ধ করব নাকি স্নুজ দেব? আজ কি পোশাক পরব? নাস্তায় কী খাব? অফিসে যাওয়ার পথে কোন রাস্তা ধরলে জ্যাম কম পাব? বাচ্চার স্কুলের ফি কি দেওয়া হয়েছে? ইমেইলটার উত্তর কী লিখব? লাঞ্চে কী খাব? বন্ধুর সাথে দেখা করার প্ল্যানটা কি ক্যানসেল করব? রাতে কী রান্না হবে? লোন শোধ করার ডেট কবে? নতুন ফোন কিনব নাকি পুরোনোটা দিয়েই চালাব?...
গুনে শেষ করা যাবে না! একটা গবেষণায় পড়লাম, আধুনিক মানুষ নাকি দিনে প্রায় ৩৫,০০০ সিদ্ধান্ত নেয়! শুধু খাবার নিয়েই নাকি ২০০-র বেশি সিদ্ধান্ত!
এই যে এত এত সিদ্ধান্ত, এগুলোর বেশিরভাগই কিন্তু খুব জটিল, অ্যাবস্ট্রাক্ট। এগুলোর জন্য আমাদের মস্তিষ্কের একটা অংশ, প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স (Prefrontal Cortex), তাকে প্রচুর কাজ করতে হয়। অনেকটা অফিসের সবচেয়ে ব্যস্ত ডেস্কে বসে থাকা মানুষটার মতো।
এখন প্রশ্ন হলো, শারীরিক পরিশ্রম কমলেও এই মানসিক পরিশ্রম বা সিদ্ধান্তের বোঝা কি আমাদের ক্লান্তির কারণ? উত্তরটা সম্ভবত হ্যাঁ।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, আমরা যখন একটানা অনেক মানসিক কাজ করি, অনেক সিদ্ধান্ত নিই, তখন আমাদের মস্তিষ্কে কিছু রাসায়নিক পদার্থ জমতে শুরু করে। যেমন ধরুন, গ্লুটামেট (Glutamate)। এটা অনেকটা শহরের রাস্তার মতো – শুরুতে সব ঠিকঠাক চলে, কিন্তু অতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে যেমন রাস্তায় আবর্জনা জমে গিয়ে জ্যাম লেগে যায়, তেমনি মস্তিষ্কেও এই গ্লুটামেট জমে গিয়ে আমাদের সিগন্যাল পাঠানোর প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। ফলে আমরা ক্লান্তি অনুভব করি, নতুন সিদ্ধান্ত নিতে কষ্ট হয়। শারীরিক কোনো কাজ না করেও আমরা মানসিকভাবে ভীষণ ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সুবহানআল্লাহ! আমাদের মস্তিষ্ক কত জটিল এক সৃষ্টি!
তাহলে একটা কারণ পেলাম – অতিরিক্ত সিদ্ধান্তের বোঝা এবং তার ফলে মস্তিষ্কে রাসায়নিক পরিবর্তন। এটা অনেকটা ‘ইভোলিউশনারি মিসম্যাচ’ (Evolutionary Mismatch) – মানে আমাদের আদিম মস্তিষ্কটা এই আধুনিক, অতি-সিদ্ধান্তে ভরা জীবনের সাথে ঠিক খাপ খাওয়াতে পারছে না।
এর সাথে যোগ হয় আরেকটা জিনিস – অ্যাডেনোসিন (Adenosine)। এটা আরেকটা রাসায়নিক, যা সারাদিন ধরে আমাদের মস্তিষ্কে জমা হতে থাকে আর আমাদের ঘুম ঘুম ভাব এনে দেয়। এটা শরীরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, যা আমাদের জানান দেয় যে এখন বিশ্রামের সময় হয়েছে। কিন্তু আমরা কী করি? ক্লান্তি লাগলেই চা বা কফি। এই ক্যাফেইন কী করে? সে অ্যাডেনোসিনের কাজকে আটকে দেয়। মানে, শরীর ক্লান্ত হলেও মস্তিষ্ক সেই সিগন্যালটা ঠিকমতো পায় না। আমরা জোর করে জেগে থাকি, কাজ চালিয়ে যাই। কিন্তু অ্যাডেনোসিন তো জমা হওয়া বন্ধ করে না! যখন ক্যাফেইনের প্রভাব কেটে যায়, তখন জমে থাকা সব অ্যাডেনোসিন একসাথে আমাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে – যাকে আমরা বলি ‘আফটারনুন ক্র্যাশ’। শরীর তখন জানান দেয়, "অনেক হয়েছে, এবার থামো!"
তাহলে দেখুন, দিনের বেলায় আমরা দুটো যুদ্ধ করছি। একদিকে অতিরিক্ত সিদ্ধান্তের চাপে গ্লুটামেট জমছে, অন্যদিকে স্বাভাবিক ক্লান্তির সঙ্কেত অ্যাডেনোসিনকে আমরা ক্যাফেইন দিয়ে চেপে রাখছি। ফলাফল? দিনের শেষে চরম ক্লান্তি।
এবার আসি রাতের কথায়। রাতের যুদ্ধটা আবার অন্যরকম।
আমাদের প্রত্যেকের ঘুমের একটা নিজস্ব প্যাটার্ন বা ছন্দ আছে। যাকে বলে ক্রোনোটাইপ (Chronotype)। কেউ হয়তো ‘ভোরের পাখি’, সকালে তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে ওঠে, রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে। কেউ আবার ‘রাতের পেঁচা’, রাতে অনেকক্ষণ জেগে থাকে, সকালে দেরিতে ওঠে। এটা নাকি আমাদের জিনে লেখা থাকে, এটা আমাদের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু আমাদের সমাজ, আমাদের স্কুল-কলেজ-অফিসের সময়সূচী? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেটা একটা নির্দিষ্ট ছাঁচে বাঁধা – সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা। এখন যে মানুষটা প্রকৃতিগতভাবেই রাতের পেঁচা, তার জন্য সকাল ৯টায় অফিসে তরতাজা থাকাটা কি সহজ? সে হয়তো জোর করে উঠছে, কিন্তু তার শরীর আর মন কি পুরোপুরি প্রস্তুত? আবার সেই ‘ইভোলিউশনারি মিসম্যাচ’। আমরা প্রকৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করছি।
আর সবশেষে, ঘুমের গুণগত মান (Quality of Sleep)। আমরা হয়তো ৭-৮ ঘণ্টা ঘুমাচ্ছি, কিন্তু সেই ঘুমটা কি আসলেই গভীর হচ্ছে? রাতের বেলা ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমরা কী করি? মোবাইল বা ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রাখি। এই স্ক্রিনের নীল আলো আমাদের মস্তিষ্কে এমন সঙ্কেত পাঠায় যেন এখনও দিন। ফলে মেলাটোনিন (Melatonin) নামে যে হরমোনটা আমাদের ঘুম আনতে সাহায্য করে, সেটার নিঃসরণ কমে যায়। ঘুম আসতে দেরি হয়, বা এলেও সেটা গভীর হয় না। আবার হয়তো রাতে দেরি করে কফি পান করি, যা ঘুমের স্বাভাবিক চক্রকে নষ্ট করে দেয়।
মনে রাখতে হবে, ঘুম শুধু শরীরকে বিশ্রাম দেওয়া নয়। ঘুমের মধ্যেই আমাদের মস্তিষ্ক সারাদিনের জমা হওয়া আবর্জনা (যেমন সেই গ্লুটামেট, অ্যাডেনোসিন) পরিষ্কার করে। স্মৃতিগুলোকে গোছায়। শরীর নিজেকে মেরামত করে। এখন যদি ঘুমটাই ঠিকমতো না হয়, গভীর না হয়, তাহলে এই পরিষ্কার করার কাজটাও ঠিকভাবে হবে না। ফলে পরের দিন ঘুম থেকে উঠেও আমরা ক্লান্ত বোধ করি, কারণ আগের দিনের ‘মানসিক আবর্জনা’ তখনও কিছুটা রয়ে গেছে! শরীরটা তো আল্লাহর দেওয়া আমানত, এর যত্ন নেওয়া কি আমাদের দায়িত্ব না?
