আমাদের চিন্তার জগৎটা কি প্রসারিত হচ্ছে, নাকি সংকুচিত হয়ে আসছে?


আগে আমরা রাস্তা চেনার জন্য কত কিছু মনে রাখতাম – এই মোড়টা, ওই দোকানটা, অমুক বাড়িটা। নিজের মাথার ভেতরেই একটা মানচিত্র তৈরি হয়ে যেত। এখন? গুগল ম্যাপস আছে। বোতাম
টিপলেই পথ দেখিয়ে দেয়। নিঃসন্দেহে এটা অনেক সুবিধার, সময় বাঁচায়। কিন্তু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, যারা খুব বেশি জিপিএস ব্যবহার করেন, তাদের নিজেদের দিক চেনার ক্ষমতা, ম্যাপ মনে রাখার ক্ষমতা কমে যায়। সুবিধা পেতে গিয়ে আমরা হয়তো অজান্তেই নিজেদের একটা স্বাভাবিক ক্ষমতাকে দুর্বল করে ফেলছি।

এটা তো গেল শুধু রাস্তা চেনার মতো একটা সাধারণ বিষয়। এবার ভাবুন তো লেখালেখি, ছবি আঁকা, গল্প তৈরি করা, এমনকি জটিল সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও যখন আমরা ক্রমাগত এআই-এর সাহায্য নিচ্ছি, তখন কী হচ্ছে?
আমি সেদিন একটা লেখা পড়ছিলাম, একজন অধ্যাপক খেয়াল করলেন করোনার সময়ে হঠাৎ তার কিছু ছাত্রের লেখার মান অনেক ভালো হয়ে গেল। কিন্তু পরে জানা গেল, তারা আসলে এআই টুল ব্যবহার করে লিখছিল। টুলগুলো তাদের লেখা ভালো করে দিচ্ছিল, কিন্তু তাদের নিজেদের লেখার দক্ষতা বাড়ছিল না।
এখানেই আমার খটকাটা লাগে। প্রযুক্তি আমাদের সাহায্য করার জন্য এসেছে, অসাধারণ সব কাজ দ্রুত করে ফেলার ক্ষমতা দিচ্ছে। তথ্য খুঁজে বের করা, গুছিয়ে লেখা, ডিজাইন করা – কত কী! কিন্তু যখন আমরা চিন্তা করার মূল কাজটাই মেশিনের হাতে ছেড়ে দিচ্ছি, তখন কি আমরা নিজেদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ – আমাদের মস্তিষ্ক, আমাদের বিচারবুদ্ধি – এটাকে অলস বানিয়ে ফেলছি না?
আমাদের ব্রেইনটা অনেকটা মাসল বা পেশীর মতো। যত ব্যবহার করবেন, যত চ্যালেঞ্জ দেবেন, তত শক্তিশালী হবে। কিন্তু যদি আমরা সব কঠিন কাজ, সব চিন্তার ভার যন্ত্রের ওপর দিয়ে দিই, তাহলে সেই ‘মানসিক পেশী’ কি ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে পড়বে না? যাকে বলে কগনিটিভ অফলোডিং (Cognitive Offloading) – মানে চিন্তার ভার অন্যের বা যন্ত্রের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। আমরা হয়তো ভাবছি, কাজটা তো হয়ে যাচ্ছে! কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এটা আমাদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করার, গভীরভাবে ভাবার ক্ষমতা কমিয়ে দিতে পারে।
এখন তো এমন এআই এসেছে, যারা যেকোনো বিষয়ে পাতার পর পাতা লিখে দিতে পারে, ছবি এঁকে দিতে পারে, প্ল্যান বানিয়ে দিতে পারে। দেখে মনে হয়, বাহ, কত সহজ! কিন্তু এই সহজলভ্যতার একটা বিপদও আছে। এই যে এআই এত তথ্য দিচ্ছে, এর কতটা সঠিক? কতটা নির্ভরযোগ্য? আমরা কি সেটা যাচাই করছি? নাকি স্ক্রিনে যা দেখছি, সেটাই সত্যি বলে ধরে নিচ্ছি?
কয়েকদিন আগে দেখলাম, গুগল সার্চের উপরে এআই একটা সামারি দেখানো শুরু করেছে। কিন্তু শুরুতে নাকি সেখানে অনেক ভুল তথ্যও আসছিল! ভাবুন একবার, যদি আমরা যাচাই না করে সেই ভুল তথ্যকেই বিশ্বাস করতে শুরু করি, তাহলে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে ব্যাপারটা? এই যে ইন্টারনেটে এখন এত লেখা, এত কন্টেন্ট – এর একটা বড় অংশই নাকি এআই দিয়ে তৈরি বা অনুবাদ করা। আর এআই যখন নিজেই নিজের তৈরি করা বা অন্য এআই-এর তৈরি করা ডেটা থেকে শিখতে থাকে, তখন ভুলের পরিমাণ বাড়বে, তথ্যের মান আরো খারাপ হবে। এটাকে ‘মডেল কলাপ্স’ (Model Collapse) বলে। মানে, জ্ঞানের উৎসটাই যদি দূষিত হতে শুরু করে? ভয়ংকর না ব্যাপারটা?
ইসলাম আমাদের জ্ঞান অর্জন (ইলম হাসিল) করতে উৎসাহিত করে, গভীরভাবে চিন্তা করতে বলে। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে ভাবতে বলে। কিন্তু যদি আমরা সেই চিন্তার প্রক্রিয়াটাই আউটসোর্স করে দিই, যদি প্রশ্ন করার, সন্দেহ করার, যাচাই করার অভ্যাসটাই হারিয়ে ফেলি, তাহলে কি আমরা জ্ঞানার্জনের মূল স্পিরিটটাকেই অবহেলা করছি না? সত্য আর মিথ্যার ফারাক বোঝার যে ক্ষমতা আল্লাহ আমাদের দিয়েছেন, সেটার যত্ন কি নিচ্ছি?
আরেকটা জিনিস খেয়াল করেছেন? সোশ্যাল মিডিয়া বা ইউটিউবের কথাই ধরুন। আমরা কী দেখব, কী পড়ব, কী শুনব – তার বেশিরভাগটাই ঠিক করে দিচ্ছে অ্যালগরিদম। আমরা হয়তো ভাবছি, আমরা নিজেরা পছন্দ করছি। কিন্তু আসলে কি তাই? নাকি অ্যালগরিদম আমাদের পছন্দগুলোকেই ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণ করে ফেলছে? আমরা কি ক্রমশ অ্যালগরিদমের তৈরি করে দেওয়া দুনিয়াতেই সন্তুষ্ট হয়ে পড়ছি? নিজেরা সক্রিয়ভাবে কিছু খোঁজার, জানার আগ্রহ কি কমে যাচ্ছে?
আমি প্রযুক্তি বা এআই-এর বিপক্ষে নই। মোটেই না। এগুলো অসাধারণ টুলস। ঠিকমতো ব্যবহার করতে পারলে এগুলো আমাদের অনেকদূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। যেমন ধরুন, অনেক আগে যখন ক্যালকুলেটর বা স্প্রেডশিট এসেছিল, অনেকে ভয় পেয়েছিল যে মানুষের আর অঙ্ক করার দরকার হবে না, বা হিসাব রাখার কাজ চলে যাবে। কিন্তু তা তো হয়নি। বরং এগুলো মানুষের কাজকে আরও সহজ করেছে, আরও নির্ভুল করেছে, আরও প্রোডাক্টিভ করেছে।
সমস্যাটা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যাটা আমাদের ব্যবহারে। আমরা কি এটাকে একটা সাহায্যকারী বন্ধু হিসেবে নিচ্ছি, নাকি আমাদের চিন্তার "প্রভু" বানিয়ে ফেলছি? পার্থক্যটা এখানেই। এআই আমাদের তথ্য দিতে পারে, অপশন দিতে পারে, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা, গভীর বিশ্লেষণটা, নৈতিক বিচারটা – সেটা আমাদের নিজেদেরই করতে হবে। এআই জ্ঞান দেখাতে পারে, কিন্তু প্রজ্ঞা (হিকমাহ) আসে অভিজ্ঞতা, বিচারবুদ্ধি আর গভীর চিন্তা থেকে।
তাই আমার মনে হয়, আমাদের খুব সচেতন থাকতে হবে। এই যে এত প্রযুক্তি আমাদের ঘিরে রেখেছে, এর মাঝে নিজেদের চিন্তার ক্ষমতাকে সজাগ রাখতে হবে। প্রশ্ন করতে হবে, যাচাই করতে হবে, ভিন্নমত শুনতে হবে। সহজে পাওয়া উত্তরে সন্তুষ্ট না হয়ে আরও গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। হয়তো একটু কষ্ট হবে, একটু সময় বেশি লাগবে। কিন্তু নিজের চিন্তার পেশীটাকে সচল রাখাটা জরুরি। কারণ দিনশেষে, মানুষ হিসেবে আমাদের পরিচয় তো আমাদের চিন্তার ক্ষমতার সাথেই সবচেয়ে বেশি জড়িত।
এই যে আমরা ছুটে চলেছি, এর মাঝে একটু থামা দরকার। একটু ভাবা দরকার – আমরা কি আসলেই প্রযুক্তির সাহায্য নিচ্ছি, নাকি এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছি? আমাদের চিন্তার জগৎটা কি প্রসারিত হচ্ছে, নাকি সংকুচিত হয়ে আসছে?
Previous Post Next Post