কখনো কি গভীর জঙ্গলে, একা বসে প্রকৃতির শব্দ শুনেছেন? বা বিশাল পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নীচের উপত্যকার দিকে তাকিয়ে থেকেছেন? কিংবা উত্তাল সমুদ্রের তীরে বসে অনন্ত জলরাশির দিকে তাকিয়ে মনে হয়েছে, এই বিশালতার মাঝে আমি কত ক্ষুদ্র!
আমাদের সবারই জীবনে এমন অনেক মুহূর্ত আসে যখন সবকিছু আমাদের মনের মতো হয় না। তখন আমরা হতাশ হই, রেগে যাই, কিংবা পরিস্থিতিটাকে অস্বীকার করতে চাই। কীভাবে আমরা আমাদের পছন্দ-অপছন্দের দাস হয়ে পড়ি আর নিজেদের অজান্তেই তৈরি করি এক মানসিক যুদ্ধ। এই মহাবিশ্বের, এই সৃষ্টির এক নিজস্ব ছন্দ আছে, এক বিশাল পরিকল্পনা আছে। সেই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই পৃথিবীতে কোটি কোটি বছর ধরে জীবন টিকে আছে, প্রকৃতি তার নিয়ম মেনে চলছে।
আমরা আমাদের "এটা ভালো লাগে", "ওটা খারাপ লাগে- এই ভাবনাগুলোর ওপর কতটা গুরুত্ব দিই? আর এই পছন্দ-অপছন্দের ওপর ভিত্তি করেই আমাদের চারপাশের বাস্তবতাকে বিচার করি। কিন্তু জীবনের পথে চলতে গিয়ে এমন অনেক কিছুই ঘটে যা আমাদের পছন্দের তালিকায় থাকে না। তখন কী হয়? আমরা হয় হতাশায় ভুগি, নয়তো পরিস্থিতির সঙ্গে লড়াই করতে গিয়ে আরও ক্লান্ত হয়ে পড়ি।
আসলে, আমাদের জীবনের দুটো স্তর আছে। একটা হলো শারীরিক বা বাহ্যিক স্তর, যেখানে অনেক কিছুই আমাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ঘটে যায়। যেমন, হঠাৎ গাড়ির টায়ার হঠাত নষ্ট হয়ে যাওয়া। আরেকটা হলো মানসিক বা আবেগের স্তর। মজার ব্যাপার হলো, বাইরের ঘটনা আমরা নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলেও, সেই ঘটনার প্রতি আমাদের মানসিক প্রতিক্রিয়া কিন্তু আমরা চাইলেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। আমরা রেগে যাব, না শান্ত থাকব- এই সিদ্ধান্তটা আমাদের।
অনেকেই জীবনের একটা পর্যায়ে এসে দিশেহারা বোধ করেন। মনে হয়, আমি কী করছি? আমার জীবনের উদ্দেশ্য কী? কিন্তু একটা সময় আমি উপলব্ধি করেছি, হয়তো আমাদের সবকিছু জানার কথাও নয়! হয়তো জীবনের আসল সৌন্দর্যটাই লুকিয়ে আছে এই অজানা পথে চলার মধ্যে, প্রতি মুহূর্তে নতুন কিছু শেখার মধ্যে।
এই উপলব্ধিটা খুব সাধারণ মনে হলেও এর গভীরতা অনেক। এর মানে এই নয় যে আমরা চেষ্টা করা ছেড়ে দেব বা হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকব। বরং এর মানে হলো, আমরা আমাদের সেরাটা দিয়ে চেষ্টা করব, কিন্তু ফলের জন্য অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা করব না। যা হচ্ছে, তা মেনে নেওয়ার সাহস রাখব। ঠিক যেমন নদীতে সাঁতার কাটার সময় স্রোতের বিপরীতে লড়াই না করে স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে দিলে সহজে এগিয়ে যাওয়া যায়, জীবনটাও অনেকটা তেমনই।
আমাদের মন এক অসাধারণ শক্তিশালী যন্ত্র। একে যদি আমরা ইতিবাচকভাবে ব্যবহার করতে শিখি, তাহলে অনেক মানসিক যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। যখনই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি আসবে, একটু থেমে নিজেকে প্রশ্ন করুন- আমি কি এটা নিয়ন্ত্রণ করতে পারি? যদি না পারি, তাহলে অযথা শক্তি ক্ষয় করে লাভ কী? তার চেয়ে বরং পরিস্থিতিটাকে গ্রহণ করে, তা থেকে কিছু শিখে এগিয়ে যাওয়াই কি ভালো নয়?
এই আত্মসমর্পণ বা মেনে নেওয়ার অভ্যাসটা একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিন ছোট ছোট ঘটনার মধ্যে দিয়ে এর অনুশীলন করতে হয়। যখনই মন বিক্ষুব্ধ হবে, কয়েকটা গভীর শ্বাস নিন, নিজের অনুভূতিগুলোকে বোঝার চেষ্টা করুন এবং তারপর শান্তভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করুন।
