কুরআনে কী কী ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির পূর্বাভাস আছে?


পবিত্র কুরআনে এমন কিছু আয়াত আছে যা টেলিপোর্টেশনের মতো অত্যাধুনিক প্রযুক্তির দিকে ইঙ্গিত করে। হয়তো আপনিও সেই আয়াতগুলো পড়েছেন, কিন্তু না বুঝেই এড়িয়ে গেছেন। কুরআন এমন এক অলৌকিক গ্রন্থ যা ১৪০০ বছর পরেও তার ভেতরের রহস্য একে একে উন্মোচিত করছে। আর আজ আমরা কুরআনের এমন কিছু আয়াত নিয়ে আলোচনা করব যা বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অনেক আবিষ্কারের পূর্বাভাস দেয়।


কুরআনে শুধুমাত্র আমাদের বর্তমান সময় নয়, এমন সব প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে যা আমরা হয়তো এখনো কল্পনাও করতে পারিনি। যেমন: টেলিপোর্টেশন, সময় ভ্রমণ, এমনকি প্রাণীদের ভাষা বোঝার ক্ষমতাও। অবিশ্বাস্য শোনাতে পারে, কিন্তু এর অনেক কিছুই বাস্তবে বৈজ্ঞানিকভাবে পরীক্ষিত হয়েছে।


কুরআনে যে অসংখ্য বৈজ্ঞানিক নিদর্শনের কথা বলা আছে, তার কয়েকটি এখানে তুলে ধরছি:


সূরা আয-যারিয়াত, আয়াত ৪৭ এ বলা হয়েছে, মহাবিশ্ব সম্প্রসারিত হচ্ছে।


সূরা আল-হাদীদ, আয়াত ২৫ এ বলা হয়েছে, আকাশ থেকে লোহা পাঠানো হয়েছে। (আধুনিক বিজ্ঞান অনুযায়ী, পৃথিবীর লোহা আসে মহাকাশ থেকে)


সূরা আয-যুমার, আয়াত ৬ এ বলা হয়েছে, ভ্রূণ মায়ের গর্ভে তিন স্তরের অন্ধকারে বৃদ্ধি পায়। (যা এমব্রায়োলজির গবেষণায় প্রমাণিত)


সূরা আন-নূর, আয়াত ৪০ এ গভীর সমুদ্রের অন্ধকারের কথা বলা হয়েছে।


সূরা আন-নাবা, আয়াত ১২ এ বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন স্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।


সূরা আন’আম, আয়াত ১২৫ এ উচ্চতার সাথে সাথে বায়ুর চাপ কমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে।


সূরা আল-ক্বিয়ামাহ, আয়াত ৪ এ বলা হয়েছে, প্রত্যেক মানুষের আলাদা আলাদা আঙ্গুলের ছাপ রয়েছে। (যা ফরেনসিক সায়েন্স নিশ্চিত করে)


সূরা আত-তারিক, আয়াত ১১ এ বলা হয়েছে, আকাশ প্রতিফলনশীল (অর্থাৎ আকাশ থেকে শব্দ বা তরঙ্গ প্রতিফলিত হয়, যা রাডার প্রযুক্তির ভিত্তি)।


সূরা আল-হিজর, আয়াত ২২ এ পরাগায়নে বায়ুর ভূমিকার কথা বলা হয়েছে।


এগুলো কুরআনের শত শত বৈজ্ঞানিক নিদর্শনের সামান্য কিছু উদাহরণ, যা আবিষ্কৃত হয়েছে এবং সবগুলোই সত্য প্রমাণিত হয়েছে।


এখন প্রশ্ন হল, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির পূর্বাভাস কি কুরআনে আছে?


যদি কুরআনের এসব আয়াত সত্য হয়, তাহলে এর ভেতরে আরও অনেক গোপন রহস্য থাকতে পারে যা ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির ইঙ্গিত দেয়। এবার আমরা কুরআনের কিছু আয়াত এবং ঘটনার দিকে তাকাবো যা টেলিপোর্টেশনের সাথে সম্পর্কিত।


কুরআনের বর্ণনায় টেলিপোর্টেশনের একটি বাস্তব ঘটনা দেখা যায়। এই ঘটনাটি সূরা আন-নমল এর ৩৮ থেকে ৪০ আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। নবী সুলাইমান (আঃ) তাঁর দরবারের সভাসদদেরকে বলেন, "হে সর্দারবর্গ! তোমাদের মধ্যে এমন কে আছে যে তাদের আত্মসমর্পণের পূর্বেই বিলকিসের সিংহাসন আমার কাছে এনে দিতে পারবে?"


এক শক্তিশালী জ্বীন (ইফ্রিত) বলল, "আপনি আপনার স্থান থেকে ওঠার পূর্বেই আমি তা আপনার কাছে এনে দেব। আমি অবশ্যই এর জন্য শক্তিধর এবং বিশ্বস্ত।"


এরপর কিতাবের জ্ঞান থাকা এক ব্যক্তি (বর্ণনানুযায়ী হযরত সুলাইমানের উজির আসিফ ইবনে বারখিয়া) বলল, "আপনার চোখের পলক ফেলার পূর্বেই আমি তা আপনার কাছে এনে দেব।"


আর যখন সুলাইমান (আঃ) সিংহাসনটিকে তাঁর সামনে রক্ষিত দেখলেন, তিনি বললেন, "এটা আমার রবের অনুগ্রহ থেকে।"


বিলকিসের সিংহাসন ইয়েমেনের সাবা থেকে জেরুজালেমে তাৎক্ষণিকভাবে চলে এসেছিল। এই দুই স্থানের দূরত্ব হাজার হাজার কিলোমিটার! স্বাভাবিক উপায়ে এটা সম্ভব নয়। "চোখের পলক ফেলার পূর্বেই" - এই কথাটি অত্যন্ত অল্প সময়, প্রায় তাৎক্ষণিক বোঝায়। এটা কি টেলিপোর্টেশনের এক রূপের ইঙ্গিত নয়?


আজ আমরা টিভিতে বা অনলাইন স্ট্রিমিং-এ হাজার হাজার কিলোমিটার দূর থেকে সরাসরি ছবি দেখতে পাই। এটিও এক ধরণের তথ্য স্থানান্তর। কিন্তু কুরআনে যা বলা হয়েছে, তা শুধু তথ্য নয়, একটি বিশাল আকারের বাস্তব সিংহাসন! কল্পনা করুন, একটি বিশাল সিংহাসন হঠাৎ করে আপনার পাশে এসে হাজির হলো। কুইন বিলকিসের সিংহাসন ছিল ইয়েমেনে, কিন্তু তা এসে হাজির হলো শামে ( দামাস্কাস বা জেরুজালেম)। ঠিক এভাবেই, শারীরিকভাবে অথবা স্পষ্ট ছবির আকারে। এমনকি সিংহাসনের আশেপাশে থাকা মানুষগুলোকে দেখা এবং তাদের কথা শোনাও যাচ্ছিল! এই ঘটনাটি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির খুব গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। ১৪০০ বছরেরও বেশি আগে কুরআন আমাদের জানিয়েছিল যে, পদার্থকে মুহূর্তের মধ্যে দীর্ঘ দূরত্বে স্থানান্তর করা সম্ভব। 


আজ আমরা এটি অন্যভাবে করি - টিভি ক্যামেরা এবং লাইভ ব্রডকাস্টের মাধ্যমে। দূরবর্তী স্থানের একটি জীবন্ত ছবি আমাদের সামনে মুহূর্তে হাজির হয়। তাহলে কুরআন কীভাবে ১৪০০ বছর আগে এমন একটি জিনিসের কথা উল্লেখ করতে পারে, যখন মানুষ এটা কল্পনাও করতে পারত না? এটা স্পষ্টভাবে দেখায় যে কুরআন কোনো মানুষের বাণী নয়।


এবার আমাদের মূল আলোচনায় ফিরে আসি। কুরআনে উন্নত প্রযুক্তির আর কী কী ইঙ্গিত দেওয়া আছে? নবী সুলাইমান (আঃ)-কে বাতাস নিয়ন্ত্রণ এবং প্রাণীদের ভাষা বোঝার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। এর ফলে তিনি খুব দ্রুত দীর্ঘ দূরত্ব ভ্রমণ করতে পারতেন। সূরা সাবা, আয়াত ১২ এ আল্লাহ বলেন, "এবং আমরা সুলাইমানের অধীনে বায়ুকে বশীভূত করে দিয়েছিলাম, যা সকালে এক মাসের পথ চলত এবং সন্ধ্যায় এক মাসের পথ চলত।" এর মানে হলো, এক মাসের পথ মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পাড়ি দেওয়া যেত। এটা কি বর্তমান সময়ের বিমান আবিষ্কারের স্পষ্ট ইঙ্গিত নয়? আজ সঠিক প্রযুক্তির মাধ্যমে আমরাও বাতাসের শক্তি ব্যবহার করে বিমান তৈরি করি, যা এক মাসের দূরত্ব কয়েক ঘণ্টায় পাড়ি দিতে পারে।


সুলাইমান (আঃ)-এর প্রাণীদের ভাষা বোঝার ক্ষমতাও একটি আশ্চর্যজনক বিষয়। সূরা আন-নমল, আয়াত ১৮ এ তিনি পিঁপড়ার কথা বুঝতে পারার কথা বলা হয়েছে, এবং আয়াত ২২ এ পাখির সাথে তাঁর যোগাযোগের কথা বলা হয়েছে। আসলে এটা কেমন ইঙ্গিত হতে পারে? প্রাণীদের ভাষা বোঝার ক্ষমতা কি ভবিষ্যৎ-এ ইঙ্গিত দেয় যে মানুষ প্রাণীদের ক্ষমতা ও আচরণ আরও ভালোভাবে বুঝতে পারবে এবং তাদের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করতে পারবে? শুধু কল্পনা করুন, পৃথিবীতে হাজার হাজার প্রজাতির প্রাণী রয়েছে। যদি আমরা তাদের যোগাযোগ বুঝতে পারি এবং তাদের প্রশিক্ষণ দিতে পারি, তাহলে সম্ভাবনাগুলো আমাদের আজকের কল্পনার চেয়েও অনেক বেশি প্রসারিত হবে। যেমন, পায়রা ব্যবহার করে চিঠি পাঠানো হতো, টিয়াকে কথা বলা শেখানো যায়, মাদকাশক্ত দ্রব্য সনাক্তকরণে কুকুরের শক্তিশালী ঘ্রাণশক্তি ব্যবহার করা হয়, ডলফিনদের শক্তিশালী সোনার ক্ষমতা ব্যবহার করে পানির নিচে তল্লাশি অভিযান এবং মাইন সনাক্তকরণ করা হয়, ইঁদুরদের স্পর্শকাতর নাকের কারণে তাদের ভূমি মাইন সনাক্তকরণে ব্যবহার করা হয়, বাদুড় অন্ধকারে চলাচলের জন্য শব্দ তরঙ্গ ব্যবহার করে, যা দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য নতুন সরঞ্জাম তৈরি করতে অনুপ্রাণিত করতে পারে। তাদের শব্দ ব্যবহার করে দিক নির্ণয় করতে সাহায্য করে।


তাহলে একটি সাধারণ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যাক: কেন এই বিষয়গুলো কুরআনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়নি? এর উত্তর সহজ। কুরআনের মূল লক্ষ্য প্রযুক্তি বা বিজ্ঞান ব্যাখ্যা করা নয়। এটি বিজ্ঞান বা আবিষ্কারের কিতাব নয়। কুরআনের মূল বার্তা হলো আল্লাহর নাম ও গুণাবলী দেখানো, তাঁর অস্তিত্বের নিদর্শন দেওয়া এবং মানুষকে ঈমান ও ইবাদতের দিকে পরিচালিত করা। বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ইঙ্গিতগুলো নিদর্শন হিসাবে দেওয়া হয়েছে, যাতে যারা চিন্তা করে তারা এগুলো বুঝতে পারে। চিন্তা করুন, যদি কুরআন স্পষ্টভাবে বিমানের কথা বলত, তাহলে সেটা কি বিশাল মহাকাশযান, গ্রহ-নক্ষত্রের তুলনায় খুব ছোট বিষয় হতো না? যদি এটা সরাসরি আলোর বাল্ব নিয়ে কথা বলত, তাহলে সেটা কি বিদ্যুৎ এবং উল্কাপাতের চেয়ে কম প্রভাবশালী হতো না, যা ইতোমধ্যেই শক্তির সাথে বর্ণনা করা হয়েছে? তাই কুরআন মানুষের আবিষ্কারগুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেনি, কারণ এটি ইতিমধ্যেই মহাবিশ্বের সর্বোচ্চ স্তরের সৃষ্টি নিয়ে কথা বলে। এর তুলনায় মানুষের তৈরি জিনিসগুলো ছোট। এছাড়াও, যদি কুরআন প্রতিটি আবিষ্কারের স্পষ্ট বিবরণ দিত, তাহলে ঈমানের পরীক্ষা ভেঙে যেত। ঈমানের মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছা থাকতে হবে, এবং স্পষ্ট প্রমাণ তা সরিয়ে দিতো।


তাহলে এই সব অলৌকিক ঘটনা এবং নিদর্শনগুলির পেছনের মূল বার্তা কী? কুরআন কোনো মানুষের বাণী হতে পারে না। ১৪০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে ছড়িয়ে থাকা এই নিদর্শনগুলি দেখায় যে কোনো মানুষ সকল জাতির সাথে এবং সকল সময়ে এত গভীর ও নির্ভুল জ্ঞানের সাথে কথা বলতে পারে না। একমাত্র তিনিই যিনি পুরো মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন, যিনি সময়ের বাইরে বিদ্যমান, তিনিই এভাবে কথা বলতে পারেন। এই কারণেই কুরআন অবশ্যই আল্লাহর বাণী। এবং সম্ভবত আমরা এ পর্যন্ত যা আবিষ্কার করেছি তা কুরআনের অলৌকিক ঘটনার একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। যেমন বিজ্ঞান এগিয়ে যাচ্ছে, আমরা নতুন নতুন নিদর্শন খুঁজে বের করব যা আমরা আগে কখনও লক্ষ্য করিনি।


কিছু মানুষের ঈমান বাড়বে, আবার কিছু মানুষ অজুহাত খুঁজে অস্বীকার করতে থাকবে।

Previous Post Next Post