জীবন কি সত্যিই একটা খেলা? হয়তো হ্যাঁ, হয়তো না। কিন্তু একটা জিনিস সত্যি- জীবনের প্রতিটা ধাপে আমাদের কিছু না কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয়, কিছু পরিস্থিতিতে পড়তে হয় যেখানে আমাদের পছন্দের উপর নির্ভর করে এর পরিণাম। এই রাস্তা দিয়ে যাবো নাকি অন্যটা দিয়ে? এই চাকরিটা করবো নাকি অন্যটা খুঁজবো? এই মানুষটিকে বিশ্বাস করবো নাকি করবো না? প্রতিটা সিদ্ধান্তই যেন খেলার এক-একটা চাল।
আমাদের সিদ্ধান্তগুলো আসলে গাণিতিক সূত্র দিয়ে বোঝা সম্ভব, আর সেরা সিদ্ধান্তটিও হিসাব করে বের করা যেতে পারে। যেমন ধরুন, ‘প্রিজনার'স ডিলেমা’ নামের গেম থিওরির খুব বিখ্যাত একটি সমস্যা। ‘গোল্ডেন বলস’ নামে একটি ব্রিটিশ টিভি শো আছে। এখানে দুই প্রতিযোগী একটি জ্যাকপট ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ পান। তাদের কাছে দুটো অপশন থাকে - ‘স্প্লিট’ (ভাগ করা) অথবা ‘স্টিল’ (চুরি করা/পুরোটা নিজে নিয়ে নেওয়া)। তারা দুজনেই গোপনে তাদের পছন্দ বেছে নেন।
নিয়মটা হলো:
যদি দুজনেই ‘স্প্লিট’ বেছে নেন, তাহলে তারা জ্যাকপটটা ভাগ করে নেন।
যদি একজন ‘স্টিল’ এবং অন্যজন ‘স্প্লিট’ বেছে নেন, তাহলে যে ‘স্টিল’ বেছে নিয়েছে সে পুরো জ্যাকপট পায় আর অন্যজন কিছুই পায় না।
যদি দুজনেই ‘স্টিল’ বেছে নেন, তাহলে দুজনেই কিছুই পায় না।
গেম থিওরি অনুযায়ী, এখানে যুক্তিসঙ্গত সিদ্ধান্ত হলো ‘স্টিল’ বেছে নেওয়া। কারণ আপনি যদি ‘স্টিল’ বেছে নেন, তাহলে অন্যজন ‘স্প্লিট’ বেছে নিলেও আপনি জেতেন, আর অন্যজন ‘স্টিল’ বেছে নিলেও আপনার হার সবচেয়ে কম হয়। কিছুই না পাওয়ার চেয়ে অন্যজনের স্প্লিট বেছে নেওয়ার সুযোগ হারানোটা যুক্তিসঙ্গতভাবে ভালো। কিন্তু এই যুক্তির ফাঁদে পড়ে যদি দুজনেই ‘স্টিল’ বেছে নেয়, তাহলে তাদের দুজনেই শূন্য হাতে ফেরে, যা আসলে তাদের দুজনের জন্যেই সবচেয়ে খারাপ ফলাফল। আদর্শিকভাবে দুজনে ভাগ করে নিলেই সবচেয়ে ভালো হতো!
তাহলে কি গেম থিওরি জীবনের সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে? না, কারণ জীবনটা শুধু যুক্তির খেলা নয়। মানুষ অনেক সময় অযৌক্তিক আচরণ করে। যেমন ধরুন, একটা কয়েন টসের কথা। হেড বা টেইল আসার সম্ভাবনা ৫০/৫০। কিন্তু মানুষ দেখি ‘হেডস’ বেছে নিতে একটু বেশি পছন্দ করে! কেন? কারণ ‘হেডস’ শব্দটা ‘টেইলস’-এর আগে আসে, অথবা হয়তো এর অন্য কোনো কারণ আছে! এটা যুক্তির বাইরের একটা পক্ষপাতিত্ব।
আরেকটা উদাহরণ হলো ‘আলটিমেটাম গেম’। এখানে একজন প্রস্তাবকারী এবং একজন গ্রহণকারী থাকে। প্রস্তাবকারী একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ কিভাবে ভাগ করা হবে তার প্রস্তাব দেয়। গ্রহণকারী সেই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে অথবা প্রত্যাখ্যান করতে পারে। গ্রহণ করলে দুজনেই প্রস্তাব অনুযায়ী টাকা পায়, কিন্তু প্রত্যাখ্যান করলে কেউই কিছু পায় না। গেম থিওরি অনুযায়ী, প্রস্তাবকারী ১০০০ টাকা নিজে রেখে বাকিটা দিলেও গ্রহণকারীর তা মেনে নেওয়া উচিত, কারণ ১০০০ টাকা না পাওয়ার চেয়ে পাওয়া ভালো। কিন্তু বাস্তবে মানুষ অনেক সময় কম টাকার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, এমনকি কিছুই না পাওয়ার ঝুঁকি নিয়েও। কেন? কারণ অন্যায্য প্রস্তাবে তাদের রাগ হয়, তারা অসম্মানিত বোধ করে। এখানে যুক্তি নয়, কাজ করে মানুষের আবেগ আর জেদ!
আবার কিছু খেলা আছে যেখানে অনিশ্চয়তা বা ভাগ্যের ভূমিকা থাকে, যেমন ডুয়েল বা পোকার। ডুয়েলে কে কখন গুলি চালাবে, তা নির্ভর করে প্রতিপক্ষের উপর। এখানে নির্দিষ্ট কোনো সেরা মুহূর্ত নেই। পোকারে ভালো খেলার জন্য শুধু অঙ্ক জানলেই হয় না, প্রতিপক্ষের চাল বোঝা, তাদের অভিব্যক্তি পড়া (বডি ল্যাঙ্গুয়েজ) এবং মাঝে মাঝে ঝুঁকি নিয়ে ‘bluff’ করাটাও জরুরি। জীবনের অনেক পরিস্থিতিও এরকম- সেখানে শুধু যুক্তির হিসাব কাজ করে না, দরকার হয় অভিজ্ঞতা, সাহস আর দূরদৃষ্টির।
তাহলে কি গেম থিওরি একেবারে অচল? না। বিশেষ করে যখন খেলাটা বার বার খেলা হয়। ‘প্রিজনার'স ডিলেমা’ যদি একবারের বদলে অনেকবার খেলা হয়, তাহলে সেরা কৌশল বদলে যায়। প্রফেসর রবার্ট অ্যাক্সেলরড একবার Repeated Prisoner's Dilemma নিয়ে একটা টুর্নামেন্ট করেছিলেন, যেখানে বিভিন্ন কম্পিউটার প্রোগ্রাম একে অপরের সাথে খেলেছিল। এতে সবচেয়ে সফল হয়েছিল ‘টিট-ফর-ট্যাট’ নামের একটি সহজ প্রোগ্রাম।
টিট-ফর-ট্যাট-এর কৌশলটা ছিল খুবই সাধারণ:
১. প্রথম চাল: সবসময় ‘স্প্লিট’ বেছে নেওয়া।
২. পরের চালগুলো: প্রতিপক্ষ আগের চালে যা করেছে, সেটাই করা। যদি প্রতিপক্ষ ‘স্প্লিট’ করে থাকে, তাহলে পরের চালে আমিও ‘স্প্লিট’ করবো। আর যদি প্রতিপক্ষ ‘স্টিল’ (বিশ্বাসঘাতকতা) করে থাকে, তাহলে পরের চালে আমিও ‘স্টিল’ করবো।
এই সহজ প্রোগ্রামটি কেন জিতলো? এর চারটি গুণ ছিল যা আমাদের জীবনের জন্যও খুব প্রাসঙ্গিক:
১. ভালোমানুষী: এটি নিজে থেকে কখনো প্রথমে বিশ্বাসঘাতকতা করে না, যা সম্পর্ক শুরু করতে বা সহযোগিতা তৈরি করতে সাহায্য করে।
২. প্রতিরোধ: এটি কিন্তু বোকা নয়। যদি কেউ বিশ্বাসঘাতকতা করে, তবে পরের চালেই সে তার জবাব দেয়। এর মানে হলো, আপনি সহজে কারো দ্বারা শোষিত হবেন না।
৩. ক্ষমা: এটি কিন্তু পুরনো ভুল ধরে বসে থাকে না। যদি প্রতিপক্ষ বিশ্বাসঘাতকতা করার পর আবার সহযোগিতা করতে শুরু করে, টিট-ফর-ট্যাটও আবার সহযোগিতা করতে প্রস্তুত হয়ে যায়।
৪. স্পষ্টতা: এর কৌশল খুবই সহজ আর স্পষ্ট। প্রতিপক্ষ সহজেই বুঝতে পারে আপনি কেন কী করছেন।
এই ‘টিট-ফর-ট্যাট’ কৌশলটি আমাদের জীবনের অনেক ক্ষেত্রে কাজে লাগানো যায়। আমাদের সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, ব্যবসা বা সমাজে মেলামেশার ক্ষেত্রে আমরা যদি প্রথমে ভালো ব্যবহার করি, কেউ বিশ্বাসভঙ্গ করলে তার প্রতিবাদ জানাই। কিন্তু সে যদি শুধরে যায় তবে তাকে ক্ষমা করে সম্পর্কের সুযোগ দেই, আর আমাদের নীতিতে অটল থাকি- তাহলে আমরা দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হতে পারি।
অবশ্যই, জীবন শুধু গেম থিওরির সূত্রের মধ্যে বাঁধা নয়। সেখানে ভালোবাসা, সহানুভূতি, আত্মত্যাগ, এবং পরিস্থিতির জটিলতাও যুক্ত হয় যা গাণিতিকভাবে মাপা কঠিন। কিন্তু গেম থিওরি আমাদের শেখায় যে, শুধুমাত্র নিজের সর্বোচ্চ লাভের কথা ভাবলে অনেক সময় সম্মিলিতভাবে আমরা সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারি, যেমন প্রিজনারস ডিলেমার ক্ষেত্রে। আবার কখনো কখনো যুক্তির বাইরে গিয়ে আবেগের বশে নেওয়া সিদ্ধান্তও যেমন; আলটিমেটাম গেমে অন্যায্য প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা, আমাদের সম্মান বা নীতির প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়।
জীবনের খেলাটা জটিল, সব সময় ন্যায্য নয়। আমাদের হাতে কি কার্ড পড়বে, তা হয়তো আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। কিন্তু কিভাবে সেই কার্ডগুলো খেলবো, সেই সিদ্ধান্তটা আমাদের। গেম থিওরি আমাদের সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথে কিছু পথ দেখাতে পারে, বিশেষ করে যখন খেলাটা বার বার খেলতে হয়। ‘টিট-ফর-ট্যাট’ নীতির মতো একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল হয়তো আমাদের জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যেতে সাহায্য করবে- যেখানে আমরা সহযোগিতাও করবো, আত্মরক্ষা বা প্রতিবাদও করবো, আবার ক্ষমার হাত বাড়িয়ে সম্পর্ক মেরামতের সুযোগও দেবো। এভাবেই হয়তো আমরা জীবনের খেলাটাকে আরও সুন্দর, আরও সফল করে তুলতে পারবো।
