যা আমরা কোনোদিন চাইনি


আমরা তো আল্লাহর কাছে কত কিছুই চাই, তাই না? এটা দাও, ওটা দাও... লিস্ট করতে বসলে হয়তো শেষই হবে না। আচ্ছা, আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা'আলা আমাদের এমন কত কিছু দিয়েছেন, যা আমরা কোনোদিন তাঁর কাছে চাই-ই নি? মানে, চাওয়ার ধারণাটাই আমাদের মাথায় আসেনি, কিন্তু তিনি নিজের অসীম করুণা থেকে দিয়ে রেখেছেন।

প্রথমেই ভাবুন আমাদের অস্তিত্ব। আল্লাহ্ চেয়েছেন, তাই আমরা আছি। কুন ফাইয়াকুন। তিনি বললেন, 'হও', আর আমরা হয়ে গেলাম। এর চেয়ে বড় 'না চাওয়া' নেয়ামত আর কী হতে পারে? আমাদের পুরো অস্তিত্বটাই তো একটা গিফট্, যেটা আমরা চাইনি, কিন্তু পেয়েছি। আলহামদুলিল্লাহ।
এবার আসুন শরীরের কথায়। এই যে দুটো চোখ দিয়ে দেখছি, কান দিয়ে শুনছি, নাক দিয়ে শ্বাস নিচ্ছি – প্রতিটা নিঃশ্বাস! ভেবে দেখেছেন, প্রতিটা নিঃশ্বাস আমরা নিচ্ছি আর ছাড়ছি, কোনো সচেতন প্রচেষ্টা ছাড়াই?
হার্টবিট চলছে তো চলছেই, ঘুমের মধ্যেও। রক্ত সঞ্চালন হচ্ছে, খাবার হজম হচ্ছে, শরীর প্রতি মুহূর্তে নিজেকে রিপেয়ার করছে। লক্ষ কোটি কোষ একসাথে কাজ করে যাচ্ছে একটা সিম্ফোনির মতো। আমরা কি এর কোনোটা চেয়েছিলাম? আমরা কি আল্লাহর কাছে দরখাস্ত করেছিলাম যে, "হে আল্লাহ্, আমাকে এমন একটা হার্ট দিন যেটা এক মিনিটে ৭২ বার বিট করবে?" অথবা "আমাকে এমন ফুসফুস দিন যা অক্সিজেন গ্রহণ আর কার্বন ডাইঅক্সাইড ত্যাগ করতে পারবে?" না তো। তিনি দিয়েছেন। নিজে থেকে দিয়েছেন। কারণ তিনি জানেন আমাদের কী প্রয়োজন। তিনি আল-খালিক, তিনি আল-বারী, তিনি আল-মুসাওয়ির। তিনি শুধু সৃষ্টিই করেননি, নিখুঁতভাবে সৃষ্টি করেছেন এবং অবয়ব দিয়েছেন।
চিন্তা করুন আমাদের পঞ্চইন্দ্রিয়ের কথা। দেখার ক্ষমতা, শোনার ক্ষমতা, স্বাদ নেওয়ার ক্ষমতা, গন্ধ শোঁকার ক্ষমতা, স্পর্শ অনুভব করার ক্ষমতা। এগুলো ছাড়া জীবনটা কেমন হতো? আমরা কি কখনো চেয়েছিলাম যে, ফুলের গন্ধ আমাদের ভালো লাগুক, বা মায়ের হাতের রান্নার স্বাদ যেন আমরা পাই? পাখির ডাক শুনে যেন মন ভালো হয়ে যায়, অথবা প্রিয়জনের স্পর্শ যেন শান্তি এনে দেয়? এগুলো সবই ডিজাইন করা। কার ডিজাইন? সেই মহান সত্তার, যিনি আমাদের সবচেয়ে ভালো জানেন। এগুলো সেই সব নেয়ামত, যা ছাড়া আমাদের 'চাওয়ার' ক্ষমতাই হয়তো পূর্ণতা পেত না। কারণ চাওয়ার জন্যও তো আগে পারিপার্শ্বিক জগৎটাকে অনুভব করতে হয়, বুঝতে হয়। সেই বোঝার আর অনুভব করার ক্ষমতাই তো তিনি দিয়েছেন, না চাইতেই।
শুধু শারীরিক ব্যাপারই না, মানসিক আর আধ্যাত্মিক দিকগুলোও ভাবুন। আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা, শেখার ক্ষমতা, মনে রাখার ক্ষমতা, কল্পনা করার ক্ষমতা। আবেগ, ভালোবাসা, মায়া, মমতা, সহানুভূতি, এমনকি দুঃখবোধ, সেটাও তো একটা নেয়ামত। কারণ দুঃখ আছে বলেই আমরা সুখের কদর বুঝি। এগুলো আমাদের মানব অস্তিত্বের অংশ হিসেবেই তিনি গেঁথে দিয়েছেন।
আমাদের বিবেক। ভালো-মন্দের পার্থক্য বোঝার যে একটা সহজাত ক্ষমতা আমাদের মধ্যে আছে, যাকে 'ফিতরাত' বলা হয়। হয়তো পরিবেশ বা অন্য কারণে সেটা কখনও কখনও মেঘে ঢেকে যায়, কিন্তু ভেতরে কোথায় যেন একটা কম্পাস ঠিকই থাকে। এটাও তো একটা বিশাল নেয়ামত, যা আমরা চাইনি। আল্লাহ্ আমাদের সঠিক পথ দেখানোর জন্য এই অভ্যন্তরীণ গাইডেন্স সিস্টেমটা দিয়ে দিয়েছেন।
আর সবচেয়ে বড় 'না চাওয়া' নেয়ামতগুলোর একটা হলো হেদায়েত। বিশেষ করে যারা মুসলিম পরিবারে জন্মেছি, জন্মের পর থেকেই আল্লাহর নাম শোনার, ইসলামকে জানার সুযোগ পেয়েছি। আমরা কি চেয়েছিলাম যে আমাদের জন্মটা এমন পরিবারে হোক? নাকি এটাও তাঁরই নির্বাচন? আবার যারা অন্য পরিবেশে জন্মেও পরে সত্যকে খুঁজে পেয়েছেন, তাদের অন্তরে সত্যের প্রতি এই যে আকর্ষণ, এই যে খোঁজ করার ইচ্ছা – এটাও কি আল্লাহ্ তাদের অন্তরে দেননি? তিনি তো যাকে ইচ্ছা হেদায়েত দান করেন। এই হেদায়েতের আলো, ঈমানের স্বাদ – এর চেয়ে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে, যা আমরা হয়তো সচেতনভাবে চাওয়ার আগেই তিনি আমাদের জন্য সহজ করে দিয়েছেন?
আমরা চাই একটা ভালো চাকরি, একটা সুন্দর বাড়ি, একজন মনের মতো জীবনসঙ্গী। এগুলো আমাদের চাওয়া। কিন্তু এই চাওয়াগুলো চাইতে পারার জন্য যে প্ল্যাটফর্ম দরকার – একটা সুস্থ শরীর, চিন্তা করার মতো একটা মস্তিষ্ক, বেঁচে থাকার জন্য একটা পৃথিবী, শ্বাস নেওয়ার জন্য বাতাস, পান করার জন্য পানি, দেখার জন্য আলো – এই foundational জিনিসগুলো তো আমরা চাইনি। এগুলো আল্লাহ্ দিয়েছেন বলেই আমরা আমাদের জাগতিক বা পারলৌকিক 'চাওয়াগুলো' চাইতে পারছি।
কখনো ভেবে দেখেছেন, আকাশটা কেন নীল? মেঘগুলো কেন ভেসে বেড়ায়? বৃষ্টি কেন পড়ে? মাটি কেন ফসল ফলায়? এই যে প্রকৃতির পুরো সিস্টেমটা, যা আমাদের জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য – এর কোনোটার জন্য কি আমরা আবেদন করেছিলাম? সূর্য প্রতিদিন উঠবে আর ডুববে, ঋতুগুলো চক্রাকারে আসবে – এই নিয়মগুলো কে সেট করেছেন? আমরা কি বলেছিলাম, "হে আল্লাহ্, এমন একটা সিস্টেম বানান যাতে আমরা খাবার উৎপাদন করতে পারি?" না। তিনি তাঁর অসীম জ্ঞান আর প্রজ্ঞা দিয়ে এই সবকিছু তৈরি করেছেন আমাদের জন্য, আমাদের চাওয়ার অপেক্ষা না করেই। কারণ তিনি আর-রাহমান, পরম করুণাময়। তাঁর করুণা তাঁর ক্রোধের ঊর্ধ্বে। তাঁর করুণা এতটাই বিস্তৃত যে, তা আমাদের চাওয়ার বা যোগ্যতার উপর নির্ভর করে না।
মাঝে মাঝে মনে হয়, আমরা আল্লাহর কাছে যা চাই, তা যেন বিশাল সমুদ্রের পাশে দাঁড়িয়ে এক ফোঁটা পানি চাওয়ার মতো। আর তিনি না চাইতেই যে নেয়ামতের সমুদ্র আমাদের দিয়ে রেখেছেন, সেদিকে আমাদের খেয়ালই থাকে না। আমাদের শুকরিয়া বা কৃতজ্ঞতা জানানো উচিত মূলত এই 'না চাওয়া' নেয়ামতগুলোর জন্য। কারণ এগুলোর উপরেই আমাদের বাকি সবকিছু নির্ভর করে।
Previous Post Next Post