সময়ের জাদু



আপনারা কি কখনও পুরনো দিনের সেই অপটিক্যাল ইলিউশন বা চোখের ধাঁধার কথা শুনেছেন, যেখানে একটা লম্বা করিডোরের শেষে দুটো দরজা দেখা যায়, আর তার পাশে কয়েকটা কালো দাগ? প্রথম দেখায় মনে হয়, বাঁদিকের দাগটা বুঝি ডানদিকেরগুলোর চেয়ে লম্বা। কিন্তু সত্যিটা হলো, ওগুলো সবই একই মাপের! আমাদের চোখ আর মস্তিষ্ক মিলে এমন একটা দৃষ্টিভঙ্গির মায়াজাল তৈরি করে যে আমরা সহজেই বোকা বনে যাই।
মায়া মানে শুধু বিভ্রম নয়, বরং এমন কিছু নিয়ম বা প্রথা যা আমরা এতটাই অভ্যস্ত হয়ে যাই যে সেগুলোকে সত্যি বলে ধরে নিই। আর এই মায়ার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো 'সময়'। আমরা ভাবি সময় বুঝি একটা সরলরেখার মতো – অতীত থেকে বর্তমান হয়ে ভবিষ্যতের দিকে ছুটে চলেছে। মানুষ হিসেবে আমরা নাকি 'টাইম-বাইন্ডিং অ্যানিম্যাল', অর্থাৎ সময়ের বাঁধনে বাঁধা প্রাণী। আমরা অতীত মনে রাখতে পারি, বর্তমানকে অনুভব করি আর ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করি।
কিন্তু এই ভবিষ্যতের পরিকল্পনা করতে গিয়েই যত বিপত্তি! ছোটবেলা থেকে আমাদের শেখানো হয় ভবিষ্যতের জন্য দৌড়াতে। কিন্ডারগার্টেন পাশ করলে তবেই ভালো স্কুলে সুযোগ, তারপর ভালো কলেজ, ভালো চাকরি, আরও সাফল্য... যেন চোখের সামনে একটা গাজর ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে, আর আমরা সেটা ধরার জন্য ছুটেই চলেছি। যখন একটা লক্ষ্যে পৌঁছই, তখন মনে হয়, "আরে! এতো এমন কিছুই না, যা ভেবেছিলাম।" তখন আবার নতুন আরেকটা 'গাজর'-এর পেছনে দৌড় শুরু। এই করতে করতে যখন জীবনের মাঝপথে এসে দাঁড়াই, তখন মনে হয়, ধুর! যা পাওয়ার জন্য এত ছুটলাম, তা পেয়েও যেন শান্তি নেই। আসলে, আমরা ভবিষ্যতের মায়াজালে এতটাই জড়িয়ে পড়ি যে বর্তমানকে উপভোগ করতেই ভুলে যাই।
তাহলে উপায় কী? বর্তমানে বাঁচা। ঠিক যেমন আমরা গান শুনি তার শেষটা শোনার জন্য নয়, বরং প্রতিটি সুর, প্রতিটি মুহূর্ত উপভোগ করার জন্য। একটা সুন্দর জাপানি হাইকু বা চীনা কবিতার মতো, যা একটা ছোট্ট মুহূর্তকে অনন্তকালের জন্য ধরে রাখে। যেমন একটা কবিতায় বলা হয়েছে: "বসন্তে শত ফুল, গ্রীষ্মে নরম বাতাস, শরতে চাঁদ আর শীতে তুষারপাত। যদি তোমার মনে বাজে চিন্তা না থাকে, তবে প্রতিটি ঋতুই তোমার জন্য সেরা।"
আসলে, জীবনের ছোট ছোট মুহূর্তগুলোতেই আসল আনন্দ লুকিয়ে থাকে। এক কাপ কফির গন্ধ, প্রিয়জনের হাসি, ভোরের আলো, ঝরা পাতার শব্দ, এগুলোই তো সত্যিকারের বেঁচে থাকা। পুরনো দিনের সেই সূচিকর্মের কথা ভাবুন, যেখানে শিল্পীরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে ধৈর্য ধরে এক একটা ফোঁড় দিতেন। সেখানে তাড়াহুড়ো ছিল না, ছিল শুধু বর্তমানের প্রতি মনোযোগ।
আমরা বেশিরভাগ সময়ই ভবিষ্যতের চিন্তায় এতটাই মগ্ন থাকি যে বর্তমানের সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভুলে যাই। আমরা সবসময় পরের মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করি, আর এই করতে করতে জীবনটাই ফুরিয়ে যায়। আসল জীবনটা ভবিষ্যতের কোনও স্টেশনে অপেক্ষা করছে না, বরং এই মুহূর্তেই, এখানেই সেটা বইছে।



Previous Post Next Post