ঢাকার রাস্তা মানেই যেন এক অন্তহীন স্রোত। বাস, রিকশা, সিএনজি, প্রাইভেট কার- সব মিলেমিশে একাকার। হর্নের তীব্র চিৎকার, মানুষের কোলাহল, ধুলো আর ধোঁয়ার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। এই যান্ত্রিক গোলকধাঁধায় হারিয়ে যাওয়া মানুষগুলোর ভিড়ে রাহিমও একজন। সিটি বাসের জানালার ধারে বসে বাইরে তাকিয়ে আছে সে, কিন্তু তার দৃষ্টি বাইরের পৃথিবীতে নয়, আটকে আছে মনের গহীনে তৈরি হওয়া এক অন্ধকার কারাগারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষ। কাঁধে পড়ার বিশাল চাপ, সামনে ভবিষ্যতের অথৈ সাগর আর সমাজের বেঁধে দেওয়া প্রত্যাশার অদৃশ্য শেকল- সব মিলিয়ে রাহিম যেন হাঁসফাঁস করছে। একটা ছোটখাটো অ্যাসাইনমেন্টের ভুল কিংবা কুইজে সামান্য কম নম্বর পেলেই তার মনে ঝড় ওঠে। কল্পনার জগতে সে দেখতে পায় তার করুণ পরিণতি- ফাইনাল পরীক্ষায় ফেল, বন্ধুদের টিটকারি, বাবা-মায়ের দীর্ঘশ্বাস আর হতাশা। "কী হবে আমার? এই সামান্য ভুলটাই হয়তো আমার সব শেষ করে দেবে!" এই ভাবনাগুলো বিষাক্ত সাপের মতো তাকে ছোবল মারে।
অথচ বাস্তবতা হয়তো ততটা কঠিন নয়। কিন্তু রাহিমের কাছে তার কল্পনার জগৎটাই যেন একমাত্র সত্যি। রাতের পর রাত বিছানায় এপাশ-ওপাশ করে কাটে, ঘুম যেন এক অচিন পাখি, কিছুতেই ধরা দেয় না। ক্লাসের লেকচারগুলো মাথার ওপর দিয়ে চলে যায়, মনে হয় যেন কিছুই বুঝছে না, কিছুই মনে রাখতে পারছে না। মাঝে মাঝে নিজেকে বড্ড একা লাগে, মনে হয় এই বিশাল শহরে তার কষ্টের ভাগ নেওয়ার মতো কেউ নেই।
পরিবার থেকে দূরে, মেসে থাকে রাহিম। বাবা সামান্য বেতনের চাকরি করেন, মা সংসারের পাশাপাশি দুটো টিউশনি করেন। ছোট বোনটার স্কুলের খরচ, নিজের পড়ার খরচ- সব মিলিয়ে টানাটানির সংসার। রাহিমের দিকে তাকিয়ে আছে পুরো পরিবার। তাদের স্বপ্ন, তাদের আশা- সবকিছুর ভার যেন রাহিমের কাঁধে। এই দায়িত্বের বোঝা তাকে আরও বেশি নুইয়ে দেয়। তার মনে হয়, সে যদি ভালো কিছু করতে না পারে, তবে বাবা-মায়ের সব কষ্ট বৃথা যাবে। এই ভয়, এই অপরাধবোধ তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খায়।
ইসলামিক মূল্যবোধে বেড়ে ওঠা রাহিম জানে, সবকিছু আল্লাহ্র হাতে। ভরসা বা তাওয়াক্কুল রাখতে হয় তাঁর উপর। কিন্তু শত চেষ্টা করেও সে মন থেকে এই দুনিয়াবি ভয় আর অনিশ্চয়তাকে সরাতে পারে না। মাঝে মাঝে জায়নামাজে দাঁড়ালেও মন ছটফট করে, চিন্তারা ছুটে বেড়ায় পরীক্ষার খাতা থেকে চাকরির ইন্টারভিউ পর্যন্ত। মনে হয়, তার ঈমান হয়তো বড্ড দুর্বল, তাই সে আল্লাহ্র উপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছে না। এই ভাবনা তাকে আরও বেশি অপরাধী করে তোলে।
সামনে সেমিস্টার ফাইনাল। সবচেয়ে কঠিন কোর্সটার পরীক্ষা দরজায় কড়া নাড়ছে। এই পরীক্ষাটা রাহিমের কাছে যেন এক বিভীষিকা। বই খুলে বসলেই অক্ষরগুলো ঝাপসা হয়ে আসে, মনে হয় যেন মাথার ভেতর সব জট পাকিয়ে যাচ্ছে। সে চেষ্টা করে, কিন্তু কল্পনার কালো মেঘগুলো তাকে বারবার ঢেকে ফেলে। সে স্পষ্ট দেখতে পায় পরীক্ষার হলে বসে ঘামছে, প্রশ্নের উত্তর জানা সত্ত্বেও লিখতে পারছে না, সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, আর অধ্যাপক কড়া চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছেন। কল্পনায় সে দেখে, রেজাল্টের দিন তার রোল নম্বরটা নেই উত্তীর্ণদের তালিকায়। বন্ধুরা এগিয়ে যাচ্ছে, আর সে পিছিয়ে পড়ছে এক ব্যর্থ জীবনের অন্ধকারে।
বুকের ভেতরটা ধড়ফড় করে ওঠে রাহিমের। গলা শুকিয়ে আসে। হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়। "আমি পারব না... সত্যিই পারব না," ফিসফিস করে নিজেকে বলে সে। পরীক্ষার আগের রাতে বইপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকে বিছানায়, কিন্তু রাহিম সেদিকে তাকাতেও পারে না। তার মনে হয়, এই পরীক্ষা দেওয়ার চেয়ে না দেওয়া ভালো। অন্তত নিশ্চিত ব্যর্থতার মুখোমুখি তো হতে হবে না! একরাশ হতাশা আর ভয় তাকে গ্রাস করে। নিজের তৈরি করা কল্পনার কারাগারে সে যেন পুরোপুরি বন্দী হয়ে পড়েছে, মুক্তির কোনো পথই তার চোখে পড়ছে না। বাসের ঝাঁকুনিতে তার ঘোর কাটে, কিন্তু মনের ভেতরের কারাগারের দেয়ালগুলো যেন আরও শক্ত হয়ে চেপে বসে।
কয়েকটা নির্ঘুম রাত আর দিনের বেলায় ক্লাসের অমনোযোগ রাহিমকে প্রায় খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছিল। বুকের ভেতর চেপে বসা পাথরটা যেন আর সরাতে পারছিল না সে। এক বিকেলে, যখন আকাশটাও ধূসর মেঘে ঢাকা, রাহিমের মন আরও বেশি ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। সে ঠিক করল, এভাবে আর পারা যাচ্ছে না। কারো সাথে কথা বলা দরকার। মনে পড়ল কামাল স্যারের কথা। ইউনিভার্সিটির বাংলা বিভাগের প্রবীণ অধ্যাপক, কিন্তু তাঁর জ্ঞানের পরিধি শুধু বাংলা সাহিত্যে সীমাবদ্ধ নয়। জীবন, দর্শন, ধর্ম- সবকিছু নিয়েই তাঁর স্বচ্ছ ধারণা। ছাত্ররা শুধু পড়া বুঝতে নয়, জীবনের জটিলতায় পথ খুঁজতেও তাঁর কাছে যায়।
কিছুটা ইতস্তত পায়ে, বুক দুরদুর নিয়ে রাহিম গিয়ে দাঁড়াল কামাল স্যারের রুমের সামনে। দরজায় হালকা টোকা দিতেই ভেতর থেকে ভেসে এলো পরিচিত, শান্ত কণ্ঠ, "ভেতরে এসো।"
কামাল সাহেব পড়ছিলেন। রাহিমকে দেখে চশমার ফাঁক দিয়ে তাকালেন, মুখে উষ্ণ হাসি। "আরে রাহিম যে! এসো বাবা, বসো। কী খবর তোমার?"
রাহিম বসতে গিয়েও যেন ঠিক স্বস্তি পাচ্ছিল না। কীভাবে শুরু করবে, বুঝতে পারছিল না। কামাল সাহেবই সহজ করে দিলেন। "মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, মনে অনেক ঝড় চলছে। বলো, শুনতে চাই।"
যেন বাঁধ ভেঙে গেল রাহিমের। সে গড়গড় করে বলে গেল তার সব ভয়, সব দুশ্চিন্তার কথা- পরীক্ষার আতঙ্ক, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা, পরিবারের চাপ, নিজের প্রতি অবিশ্বাস। সে জানাল, কীভাবে ছোট ছোট ব্যর্থতাও তার কাছে পাহাড় সমান মনে হয়, কীভাবে সে কল্পনার জগতে নিজের ব্যর্থতার ছবি আঁকে বারবার। কথা বলতে বলতে তার গলা ধরে এলো, চোখ ভিজে উঠল।
কামাল সাহেব চুপচাপ, মনোযোগ দিয়ে সবটা শুনলেন। কোনো তাড়াহুড়ো করলেন না, কোনো মন্তব্যও করলেন না মাঝপথে। রাহিমের কথা শেষ হলে তিনি কিছুক্ষণ নীরব রইলেন, যেন তার কষ্টটা অনুভব করার চেষ্টা করছেন। তারপর ধীরেসুস্থে বললেন, "হুমম... বুঝতে পারছি তোমার অবস্থা। আচ্ছা, তোমাকে একটা গল্প বলি, শোনো।"
তিনি শুরু করলেন, "বহু বছর আগের কথা। এক দেশে ছিল এক তরুণ দৌড়বিদ। সবাই বলত, একটা নির্দিষ্ট দূরত্বের দৌড় সে কিছুতেই চার মিনিটের কমে শেষ করতে পারবে না। বড় বড় ডাক্তার, বিশেষজ্ঞরা পর্যন্ত রায় দিয়েছিলেন, মানুষের শরীর নাকি এর চেয়ে বেশি গতিতে দৌড়ানোর জন্য তৈরিই হয়নি। চেষ্টা করলে নাকি হৃৎপিণ্ড বন্ধ হয়ে যেতে পারে! হাজার হাজার বছর ধরে এই বিশ্বাসটাই সবার মনে গেঁথে গিয়েছিল। কেউ আর চেষ্টা করার সাহস পেত না।"
রাহিম মন দিয়ে শুনছিল।
কামাল সাহেব বলতে লাগলেন, "কিন্তু সেই তরুণ দৌড়বিদ এই কথায় বিশ্বাস করত না। তার মনে জেদ চেপেছিল, সে পারবেই। অন্যরা যখন বলত 'এটা অসম্ভব', সে তখন ভাবত 'কীভাবে সম্ভব করা যায়'। সে কঠোর অনুশীলন শুরু করল, শুধু শরীরের নয়, মনেরও। সে কল্পনায় বারবার দেখত, সে দৌড়াচ্ছে এবং চার মিনিটের আগেই লক্ষ্যে পৌঁছে যাচ্ছে। অবশেষে একদিন সত্যি সত্যি সে দৌড়ে অংশ নিল এবং..."
তিনি একটু থামলেন, রাহিমের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "এবং সে চার মিনিটের কম সময়েই দৌড় শেষ করে ফেলল! যা এতদিন সবাই অসম্ভব ভাবত, সে তা সম্ভব করে দেখাল। কীভাবে পারল জানো?"
রাহিম উৎসুক চোখে তাকিয়ে রইল।
"কারণ সে তার মনের ভেতরের দেয়ালটা ভেঙে ফেলেছিল," কামাল সাহেব মৃদু হেসে বললেন। "বাবা, সবচেয়ে বড় দেয়ালটা কিন্তু বাইরে নয়, আমাদের মনের ভেতরে। আমরা নিজেরাই নিজেদের বিশ্বাসের গণ্ডি তৈরি করি, আর সেই গণ্ডির ভেতরে আটকে থাকি। তুমি যেমনটা ভাবছ, তোমার কল্পনার জগৎটাই যেন তোমার বাস্তবতা হয়ে উঠেছে।"
তিনি রাহিমের কাঁধে হাত রাখলেন। "দেখো, ভয় পাওয়াটা স্বাভাবিক। কিন্তু ভয়কে জয় করার শক্তিও আল্লাহ্ আমাদের দিয়েছেন। একেই বলে জিহাদ আল-নফস- নিজের ভেতরের শয়তানের কুমন্ত্রণা, নিজের দুর্বলতার বিরুদ্ধে লড়াই। তুমি চেষ্টা করবে, এটাই তোমার কাজ- এটাই তদবীর। ফলাফল কী হবে, সেটা আল্লাহ্র হাতে- এটাই তাকদীর। কিন্তু চেষ্টার আগেই যদি তুমি হেরে যাও নিজের কল্পনার কাছে, তাহলে তো লড়াইটা শুরুই হলো না।"
তিনি একটু থামলেন। "তুমি কি নিজের উপর বিশ্বাস রাখতে পারো না? আল্লাহ্ তো তোমাকে সৃষ্টি করেছেন সেরা অবয়বে, তোমাকে মেধা দিয়েছেন, শক্তি দিয়েছেন। সেই শক্তির উপর বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখো।"
রাহিম চুপ করে রইল। স্যারের কথাগুলো তার ভেতরের কোথাও যেন নাড়া দিচ্ছিল।
কামাল সাহেব বললেন, "একটা ছোট কাজ করবে আমার জন্য? যে শিক্ষককে তোমার সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে, কাল ক্লাসের পর তাঁর কাছে গিয়ে পড়া সংক্রান্ত একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করবে। খুব সাধারণ একটা প্রশ্ন হলেও চলবে। পারবে না?"
রাহিম প্রথমে চমকে গেল। কিন্তু স্যারের শান্ত, আশ্বাস ভরা চোখের দিকে তাকিয়ে সে আস্তে করে মাথা নাড়ল। "জ্বী স্যার, চেষ্টা করব।"
"ব্যস, এটুকুই। মনে রাখবে, বিশ্বাসের দেয়াল ভাঙার শুরুটা ছোট পদক্ষেপ দিয়েই হয়।"
কামাল সাহেবের রুম থেকে যখন রাহিম বের হলো, বাইরের মেঘলা আকাশটা যেন একটু পরিষ্কার লাগছে তার কাছে। বুকের ভেতরের পাথরটা হয়তো পুরোপুরি সরেনি, কিন্তু মনে হচ্ছে সেটা আগের চেয়ে কিছুটা হালকা হয়েছে। একটা নতুন ভাবনা, একটা নতুন পথনির্দেশনা নিয়ে সে হলের দিকে হাঁটতে শুরু করল, মনের মধ্যে তখনও বাজছে স্যারের কথাগুলো- "সবচেয়ে বড় দেয়ালটা আমাদের মনের ভেতরে।"
কামাল সাহেবের রুম থেকে বেরিয়ে আসার পর রাহিমের মনে এক ধরনের অদ্ভুত প্রশান্তি কাজ করছিল। ভয়ের কালো মেঘটা পুরোপুরি কাটেনি ঠিকই, কিন্তু তার মাঝে আশার এক চিলতে রোদ উঁকি দিচ্ছিল। স্যারের দেওয়া ছোট্ট চ্যালেঞ্জটা- সবচেয়ে ভয় পাওয়া শিক্ষকের সাথে কথা বলা- তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। পারবে কি সে? মন বলছিল, ‘না, সম্ভব না’, কিন্তু স্যারের শান্ত মুখ আর বিশ্বাসের কথাগুলো তাকে সাহস যোগাচ্ছিল।
পরদিন ক্লাস শেষে বুক দুরদুর নিয়েই রাহিম এগিয়ে গেল সেই শিক্ষকের দিকে। প্রশ্নটা খুবই সাধারণ ছিল, গত ক্লাসের একটা টপিক নিয়ে। শিক্ষক প্রথমে একটু অবাক হলেও স্বাভাবিকভাবেই উত্তর দিলেন, এমনকি দুটো ভালো কথাও বললেন রাহিমের আগ্রহ দেখে। রাহিমের মনে হলো যেন পাহাড় ডিঙিয়ে ফেলেছে! ভয়টা পুরোপুরি যায়নি, কিন্তু সে যে ভয়কে পাশ কাটিয়ে কাজটা করতে পেরেছে, এই অনুভূতিটাই ছিল অসাধারণ।
বিকেলে সে আবার গেল কামাল সাহেবের কাছে, কিছুটা উত্তেজিত হয়েই জানাল তার অভিজ্ঞতার কথা। কামাল সাহেব স্মিত হেসে বললেন, "দেখলে তো? ভয়টা যতটা বড় ভেবেছিলে, ততটা কি ছিল?"
রাহিম মাথা নেড়ে জানাল, না, ছিল না।
"এটাই হয়, বাবা," কামাল সাহেব বলতে শুরু করলেন। "আমাদের চিন্তাগুলো অনেকটা আতশ কাঁচের মতো। ছোট সমস্যাকেও কয়েকগুণ বড় করে দেখায়। আবার এই চিন্তারই একটা অদ্ভুত ক্ষমতা আছে আমাদের শরীর আর মনকে নিয়ন্ত্রণ করার।"
তিনি টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ছোট কাঁচের শিশি বের করলেন। তাতে কয়েকটা ছোট, সাদা বড়ি। "এটা নাও। আমার এক পুরোনো ছাত্র জার্মানি থেকে এনেছিল। মনোযোগ বাড়াতে আর ক্লান্তি দূর করতে নাকি দারুণ কাজ করে। পরীক্ষার আগে দিনে একটা করে খেয়ো, দেখবে শরীর-মন দুটোই ঝরঝরে লাগছে।"
রাহিম দ্বিধা নিয়ে শিশিটা হাতে নিল। সত্যিই কি এটা কাজ করবে?
কামাল সাহেব হাসলেন। "বিশ্বাস করে খেয়ে দেখো। বিশ্বাসে মিলায় বস্তু, তর্কে বহুদূর- শুনেছ তো?"
পরের কয়েকদিন রাহিম নিয়ম করে একটা করে বড়ি খেল। আশ্চর্যভাবে, তার পড়তে বসার আগ্রহটা যেন একটু বাড়ল, রাতের ঘুমটাও আগের চেয়ে ভালো হতে লাগল। সে বেশ অবাক হয়েই কামাল সাহেবকে জানাল সে কথা।
কামাল সাহেব এবার রহস্যটা ভাঙলেন। "রাহিম, ওই বড়িগুলো ছিল সাধারণ ভিটামিন সি ট্যাবলেট, যা তুমি যেকোনো ফার্মেসিতেই পাবে। এর মনোযোগ বাড়ানো বা ক্লান্তি দূর করার কোনো বিশেষ ক্ষমতা নেই।"
রাহিম হতবাক! "তাহলে স্যার? আমার যে ভালো লাগল!"
"ভালো লেগেছে তোমার বিশ্বাসের কারণে," কামাল সাহেব ব্যাখ্যা করলেন। "চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে বলে 'প্লাসিবো ইফেক্ট'। যখন তুমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করো যে কোনো কিছু তোমার উপকার করবে, তখন তোমার মস্তিষ্ক এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যা সত্যিই তোমার শরীর ও মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আসল শক্তিটা ওষুধে ছিল না, ছিল তোমার মনে, তোমার বিশ্বাসে।"
তিনি বললেন, "ইসলামেও তো নিয়তের উপর ভীষণ জোর দেওয়া হয়েছে। তুমি কোন উদ্দেশ্যে কাজ করছ, তার উপর তোমার কাজের ফলাফল অনেকাংশে নির্ভর করে। তুমি যখন নামাজে দাঁড়াও, তখন যদি তোমার নিয়ত থাকে আল্লাহ্র সাথে সংযোগ স্থাপন করার, দেখবে মনটা এমনিতেই শান্ত হয়ে আসছে। আবার যখন তুমি মন থেকে দোয়া (দু'আ) করো, তখন তোমার পুরো সত্ত্বা জুড়ে একটা ইতিবাচক শক্তির প্রবাহ তৈরি হয়।"
কামাল সাহেব আরও যোগ করলেন, "চিন্তাকে নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব নয়। নেতিবাচক চিন্তা এলে সচেতনভাবে তাকে থামিয়ে দাও। চেষ্টা করো ভালো কিছু ভাবতে, আল্লাহ্র রহমতের কথা স্মরণ করতে, জিকির করতে। হয়তো প্রথমে কষ্ট হবে, বারবার হোঁচট খাবে, কিন্তু চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। একে এক ধরণের মুরাকাবা বা আত্ম-পর্যবেক্ষণও বলতে পারো।"
রাহিম স্যারের কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। তার মনে হচ্ছিল যেন একটা নতুন দরজা খুলে যাচ্ছে তার সামনে। সে বুঝতে পারছিল, তার ভেতরের কারাগারের চাবিটা আসলে তারই হাতে। চিন্তাগুলো তারই সৃষ্টি, আর সে চাইলেই এই চিন্তার ধারা বদলাতে পারে।
সেদিন থেকে রাহিম নতুন করে চেষ্টা শুরু করল। পড়ার টেবিলে বসার আগে দু'রাকাত নফল নামাজ পড়ে নিত, মনকে শান্ত করার চেষ্টা করত। যখনই মনে হতাশার কালো মেঘ জমতে চাইত, সে সচেতনভাবে আল্লাহ্র নাম নিত বা কোনো ভালো স্মৃতির কথা ভাবত। ক্লাসে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করত আগের চেয়ে বেশি। প্রতিদিনের ছোট ছোট কাজগুলো সময়মতো শেষ করার অভ্যাস করল।
পরিবর্তনটা একদিনে আসেনি। পুরোনো অভ্যাসগুলো বারবার ফিরে আসতে চাইত। কিন্তু রাহিম এবার জানত, লড়াইটা কোথায় করতে হবে। সে জানত, তার ভাবনাগুলোই তার বাস্তবতাকে গড়ছে। কামাল সাহেবের দেওয়া ভিটামিন সি ট্যাবলেটের শিশিটা সে যত্ন করে রেখে দিয়েছে, ওটা যেন তার কাছে এখন বিশ্বাসের প্রতীক। ফাইনাল পরীক্ষা তখনও কয়েক সপ্তাহ দূরে, কিন্তু রাহিমের মনে আগের সেই তীব্র আতঙ্কটা নেই। তার বদলে জায়গা করে নিয়েছে এক ধরণের শান্ত প্রস্তুতি আর আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখার চেষ্টা। সে জানে, যুদ্ধটা এখনও বাকি, কিন্তু সে এখন নিজেকে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রস্তুত মনে করছে।
ফাইনাল পরীক্ষার রুটিন চলে এসেছে। আর মাত্র দশ দিন বাকি। সেই কঠিন কোর্সটার পরীক্ষা একেবারে শেষের দিকে। যত দিন গড়াচ্ছে, রাহিমের বুকের ভেতরের সেই পুরোনো ভয়টা যেন আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইছে। রাতের বেলা বিছানায় শুয়ে পড়ার পর কল্পনার দৃশ্যগুলো আবার ফিরে আসে- পরীক্ষার হলে ঘামতে থাকা সে, কঠিন প্রশ্নপত্র, সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাওয়া, অসফলতার গ্লানি।
"আবার সেই একই চিন্তা!" রাহিম নিজেকে ধমক দেয়। সে উঠে বসে। বিছানার পাশের টেবিলে রাখা পানির গ্লাসটা হাতে নেয়। কামাল সাহেবের কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করে, "বিশ্বাসই আসল শক্তি, রাহিম। তোমার ভেতরের দেয়ালটা তোমাকেই ভাঙতে হবে।"
সে অজু করে এসে জায়নামাজে দাঁড়ায়। দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে মনটাকে শান্ত করার চেষ্টা করে। সিজদায় গিয়ে আল্লাহ্র কাছে সাহায্য চায়, যেন তিনি তাকে স্থির থাকার তৌফিক দেন, ভয়কে জয় করার শক্তি দেন। নামাজ শেষে সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকে, গভীর শ্বাস নেয়। মনে মনে আওড়ায়, "আমি চেষ্টা করব, বাকিটা আল্লাহ্র ইচ্ছা। ফলাফল যাই হোক, আমি ভয় পেয়ে পালিয়ে যাব না।"
পরের কয়েকটা দিন রাহিমের জন্য ছিল এক কঠিন লড়াই- নিজের সাথেই নিজের লড়াই। একদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতির চাপ, অন্যদিকে মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা ভয় আর নেতিবাচক কল্পনার আক্রমণ। মাঝে মাঝে মনে হতো সব ছেড়েছুড়ে বাড়ি চলে যায়। কিন্তু পরক্ষণেই কামাল সাহেবের শান্ত মুখটা ভেসে উঠত, ভেসে উঠত বাবা-মায়ের আশাবাদী মুখগুলো। সে আবার বই নিয়ে বসত, কঠিন বিষয়গুলো বন্ধুদের সাথে আলোচনা করত, নোট তৈরি করত।
সে খেয়াল করল, যখন সে ইতিবাচক থাকার চেষ্টা করছে, তখন পড়াটাও মাথায় ঢুকছে ভালো। যখন সে ভাবছে, "আমি পারব, ইনশাআল্লাহ্", তখন কঠিন সূত্রগুলোও যেন সহজ মনে হচ্ছে। আর যখনই হতাশা আসছে, তখনই পড়াটা যেন পাথরের মতো ভারী লাগছে। সে বুঝতে পারল, এটা শুধু পড়ার চাপ নয়, এটা তার মানসিক অবস্থারও প্রতিফলন।
কঠিন কোর্সটার পরীক্ষার আগের রাতে রাহিম প্রায় সারারাত জেগে পড়ল। কিন্তু এবার আতঙ্কে নয়, বরং এক ধরণের শান্ত প্রস্তুতি নিয়ে। সে জানে, সে তার সাধ্যমতো চেষ্টা করেছে। বাকিটা আল্লাহ্র উপর। সে বারবার নিজেকে মনে করিয়ে দেয়, "বাস্তবের চেয়ে কল্পনায় বেশি কষ্ট পেয়ো না।"
পরীক্ষার হলে ঢোকার মুহূর্তে বুকের ভেতরটা একটু কেঁপে উঠেছিল ঠিকই। প্রশ্নপত্র হাতে পাওয়ার পর প্রথম কয়েকটা প্রশ্ন দেখে মনে হলো যেন কিছুই পারবে না। পুরোনো ভয়টা আবার ফিরে আসতে চাইল। কিন্তু রাহিম চোখ বন্ধ করে একটা গভীর শ্বাস নিল। মনে মনে বলল, "বিসমিল্লাহ্।" তারপর ধীরেসুস্থে প্রশ্নগুলো আবার পড়ল। এবার মনে হলো, হ্যাঁ, সে পারবে। হয়তো সবগুলো প্রশ্নের উত্তর নিখুঁত হবে না, কিন্তু সে চেষ্টা করতে পারে।
তিন ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল, রাহিম টেরই পেল না। যখন সে খাতা জমা দিয়ে হল থেকে বের হলো, তার শরীর ক্লান্ত, কিন্তু মনটা আশ্চর্যরকম হালকা। সে জানে না তার পরীক্ষা কেমন হয়েছে, ফলাফল কী হবে। কিন্তু তারচেয়েও বড় কথা, সে ভয়কে জয় করতে পেরেছে। সে পালিয়ে যায়নি, লড়াই করেছে। কল্পনার কারাগারে নিজেকে বন্দী না রেখে সে বাস্তবতার মুখোমুখি হয়েছে। এটাই ছিল তার আসল পরীক্ষা, আর সেই পরীক্ষায় সে নিজেকে বিজয়ী মনে করছে।
হল থেকে বেরিয়ে খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে সে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। চারপাশের কোলাহল, গাড়ির হর্ন- সবকিছুই যেন আজ অন্যরকম লাগছে। মনে হচ্ছে যেন এক দীর্ঘ অসুস্থতার পর সে আবার সুস্থ হয়ে উঠেছে। সে কামাল সাহেবকে মনে মনে ধন্যবাদ জানাল। আজ সে বুঝতে পারছে, অন্তরের এই যুদ্ধটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন, আর এই যুদ্ধে জয়ী হওয়ার অনুভূতিটাই সবচেয়ে মধুর। ফলাফল যাই হোক, সে জানে, এই অভিজ্ঞতা তাকে জীবনের সামনের পথচলায় সাহস যোগাবে। সে শিখেছে, ভয় থাকবেই, কিন্তু সেই ভয়ের হাতে নিজেকে সঁপে দেওয়া চলবে না। বিশ্বাস আর চেষ্টার মাধ্যমে সেই ভয়কে জয় করাই জীবনের আসল লড়াই।
ফাইনাল পরীক্ষার ফলাফল বেরিয়েছে। রাহিম ভালোভাবেই পাশ করেছে, যদিও খুব চোখ ধাঁধানো রেজাল্ট হয়নি। কিন্তু তার মনে কোনো আক্ষেপ নেই। বরং এক ধরণের গভীর প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়েছে তার সত্ত্বাজুড়ে। সে এখন জানে, রেজাল্ট বা সাফল্যই জীবনের সবকিছু নয়। আসল জয়টা ছিল নিজের ভেতরের ভয় আর নেতিবাচকতাকে মোকাবিলা করার মধ্যে।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন প্রায় শেষের পথে। কিন্তু আগের সেই তীব্র অনিশ্চয়তা আর ভবিষ্যতের ভয় রাহিমকে এখন আর কাবু করতে পারে না। সে বুঝতে পেরেছে, জীবন নদীর মতো প্রবহমান। এখানে চ্যালেঞ্জ থাকবে, বাঁক থাকবে, স্রোতের টান থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। কল্পনার জগতে হাবুডুবু খেয়ে বর্তমানটাকে নষ্ট করার কোনো মানে হয় না।
একদিন লাইব্রেরিতে বসে রাহিম এলেন ল্যাঙ্গারের ‘কাউন্টারক্লকওয়াইজ’ এক্সপেরিমেন্ট নিয়ে একটা আর্টিকেল পড়ছিল। পড়তে পড়তে সে অবাক হয়ে গেল! কীভাবে মানুষের মানসিক অবস্থা, তার পারিপার্শ্বিক পরিবেশ, এমনকি তার স্মৃতি পর্যন্ত তার শারীরিক বয়স ও সক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে! আর্টিকেলটা পড়ে তার মনে হলো, কামাল স্যার ঠিকই বলেছিলেন- আমাদের মনোজগৎটাই আমাদের বাস্তবতাকে অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করে। আমাদের স্মৃতিগুলোও পাথরে খোদাই করা কোনো লিপি নয়, বরং প্রতিনিয়ত তা পরিবর্তিত ও পুনর্গঠিত হতে পারে।
রাহিম এখন আগের চেয়ে অনেক শান্ত, অনেক বেশি পরিণত। সে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, কোরআন তেলাওয়াত করে। এগুলোর মাধ্যমে সে এক ধরণের মানসিক স্থিরতা ও শান্তি খুঁজে পায়। সে শিখেছে জীবনের ছোট ছোট প্রাপ্তির জন্য আল্লাহ্র কাছে কৃতজ্ঞতা জানাতে। আর যখন কোনো কঠিন পরিস্থিতি আসে, তখন হতাশ না হয়ে ধৈর্য ধারণ করতে।
ক্যাম্পাসে হাঁটতে গিয়ে একদিন সে দেখল, এক জুনিয়র ছাত্র মুখ গোমড়া করে বসে আছে। রাহিম তার কাছে গেল, কিছুক্ষণ কথা বলল। জানতে পারল, ছেলেটাও তারই মতো পরীক্ষা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছে। রাহিম তার নিজের অভিজ্ঞতার কথা শেয়ার করল, কামাল স্যারের কথাগুলো বলল। ছেলেটার চোখে সে আশার আলো দেখতে পেল, ঠিক যেমনটা সে দেখেছিল কামাল স্যারের চোখে। রাহিম বুঝতে পারল, নিজের অভিজ্ঞতা অন্যের সাথে ভাগ করে নেওয়ার মাধ্যমেও এক ধরণের মানসিক শক্তি পাওয়া যায়।
জীবনের মানেটা রাহিমের কাছে এখন একটু একটু করে স্পষ্ট হচ্ছে। সাফল্য বা ব্যর্থতা নয়, বরং প্রতিটা মুহূর্তে সচেতনভাবে বেঁচে থাকা, নিজের চিন্তাভাবনাকে ইতিবাচক রাখা, চেষ্টার পর আল্লাহ্র উপর ভরসা রাখা আর চারপাশের মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া-
এর মধ্যেই যেন জীবনের সার্থকতা লুকিয়ে আছে।
সে এখন আর কল্পনার কারাগারে বন্দী নয়। সে জেনে গেছে, মনের আয়নায় সে যে প্রতিচ্ছবি দেখবে, তার জীবনটাও অনেকটা সেভাবেই গড়ে উঠবে। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার মনের আয়নাটাকে সে সবসময় স্বচ্ছ আর ইতিবাচক রাখার চেষ্টা করবে। কারণ সে জানে, জীবনের পথচলা সহজ নয়, কিন্তু একটি সুন্দর, স্থির ও বিশ্বাসী মন নিয়ে এগিয়ে গেলে যেকোনো কঠিন পথই পাড়ি দেওয়া সম্ভব। বিকেলের পড়ন্ত আলোয় মসজিদের মিনার থেকে ভেসে আসা আজানের ধ্বনি শুনতে শুনতে রাহিমের মনে হলো, হ্যাঁ, জীবন সত্যিই সুন্দর, যদি আমরা সুন্দরভাবে ভাবতে শিখি। আলহামদুলিল্লাহ্।
