ঘুম

 নিশুতি রাতে, যখন আকাশ জুড়ে নক্ষত্রেরা নিঃশব্দে জ্বলে,

তুমি ধীরে ধীরে ডুবে যাচ্ছো ঘুম নামক এক অলৌকিক সাগরে।

এই ঘুম কেবল বিশ্রাম নয়- এ এক মহাজাগতিক ত্যাগ।

তুমি তোমার ‘আমি’-কে রেখে দাও শরীরের পাশে,

জীবনের নাট্য মঞ্চ থেকে নামো,

আর চলে যাও এক অদৃশ্য স্তরে,

যেখানে সময়, নাম, ভূমিকা, সবকিছু মিলিয়ে যায়।





ঘুম- এ যেন ছোট্ট এক মৃত্যু।

তবে ভয়াবহ নয়,

বরং আশ্রয়দায়ী।

যেখানে মৃত্যু তোমাকে ছিন্ন করে দেয়,

ঘুম সেখানে নরম করে দেয় সবকিছু- 

তোমার ভয়গুলো, চিন্তাগুলো, আর অস্থিরতাগুলো

ধীরে ধীরে মাটির নিচে মিশে যেতে থাকে।


তুমি ঘুমোলে তুমি আর "তুমি" থাকো না,

একটি পরিচয়ের গন্ধমাত্রও অবশিষ্ট থাকে না।

এটাই কি সত্যিকারের মুক্তি নয়?


তুমি কল্পনা করো- 

এই পুরো জগত একটি বিশাল হেমন্ত বিকেল,

তুমি ক্লান্ত পাখির মতো ডানা গুটিয়ে মাটিতে নামছো।

নিরাপদ, নির্ভয়, নির্বাক।


তুমি যদি গভীরভাবে বোঝো,

ঘুম হচ্ছে আত্মার একটি পবিত্র নিঃশ্বাস।

যেখানে সৃষ্টির কেন্দ্র তোমাকে ছুঁয়ে যায়- 

তুমি নিজের মধ্যে নেমে যাও,

একটি স্তরে যেখানে ইচ্ছা নেই, ভয় নেই,

শুধু এক বিশুদ্ধ অস্তিত্ব রয়ে গেছে।


ঘুম এমন এক জায়গা,

যেখানে আল্লাহ আর তুমি, মাঝখানে কিছু রাখো না।

না কথা, না সংকেত, না যুক্তি।

শুধু নীরবতা।


তুমি কি জানো, এই ঘুমই প্রমাণ করে

তুমি প্রতিদিন নিজেকে হারিয়ে ফেরত আসতে পারো,

প্রতিদিন নিজের ছোট মৃত্যু থেকে পুনর্জন্ম নিতে পারো?


তুমি যখন জাগো,

তুমি নিজের সাথে নিয়ে আসো এক অদৃশ্য আলো- 

যেটা রাতের অচেতন যাত্রায় তুমি অর্জন করেছিলে।


এই পৃথিবীর সব কাজ, সব শব্দ, সব দৌড়ঝাঁপ শেষে

ঘুম তোমার কাছে এসে বলে,

"এসো, কিছুই না হয়ে থাকো।

কারণ কেবল তখনই তুমি জানতে পারবে- 

তোমার অস্তিত্ব শুধু চেতনার নয়,

তুমি সেই শূন্যতারও সন্তান

যেখান থেকে সব সৃষ্টি হয়।”


ঘুম, তাই কেবল বিশ্রাম নয়- 

এটা একটা আধ্যাত্মিক শিক্ষা।

যেখানে তুমি প্রতিদিন শেখো- 

ছেড়ে দিলে তবেই তুমি পূর্ণ হও।

হারিয়ে গেলে তবেই তুমি নিজেকে খুঁজে পাও।

নীরব হলে তবেই আল্লাহ তোমার ভেতরে কথা বলেন।


তুমি আজ রাতে যখন চোখ বন্ধ করবে,

জেনে রেখো- তুমি আল্লাহর হৃদয়ে এক বিন্দু হয়ে যাচ্ছো।

একটি নিঃশব্দ, চিরন্তন বিন্দু।

যার ভিতর থেকে সৃষ্টি আবার শুরু হবে।

Previous Post Next Post