ব্রেইন ডেভেলপ করার ৮ টি গোপন সূত্র



কখনো এমন হয়েছে যে, সকালে ঘুম থেকে উঠেও মাথাটা কেমন ঝিম ধরে আছে? কিংবা জরুরি মিটিংয়ের আগে মনে হচ্ছে মগজের ভেতর কেউ যেন জ্যাম লাগিয়ে দিয়েছে? ভাবছেন, বয়স বাড়ছে তাই এমন হচ্ছে? একদম নয়! আসলে আমরা নিজেরাই অজান্তে আমাদের ব্রেনের পাওয়ার কমিয়ে দিচ্ছি। কিন্তু ঘাবড়াবেন না! কিছু সহজ কৌশল বা ‘গেম হ্যাকস’ আছে, যা আপনার মগজকে করে তুলবে আরও ধারালো, স্মৃতিশক্তি হবে প্রখর আর সারাদিন থাকবেন সুপার রিফ্রেশড! চলুন, সেই গোপন সূত্রগুলো জেনে নিই: ১. সারাদিন ধরে যখন যা খুশি তাই না খেয়ে, একটা নির্দিষ্ট ৮-১০ ঘণ্টার মধ্যে দিনের সব খাবার শেষ করা। ধরুন, সকাল ১০টা থেকে সন্ধে ৬টার মধ্যে খেয়ে নিলেন। ব্যস! কেন এটা ব্রেনের জন্য ভালো? ব্রেন ল্যাগ থেকে মুক্তি: ভারী খাবার পর আমাদের হজম করতে প্রচুর শক্তি খরচ হয়, তখন মগজ যেন একটু স্লো হয়ে যায়। এই পদ্ধতিতে খেলে হজম বিভাগ ব্রেনের শক্তি চুরি করতে পারে না! যখন পেট খালি থাকে, তখন আমাদের কোষগুলো একটা দারুণ কাজ করে – নিজেদের ভেতরকার আবর্জনা, খারাপ প্রোটিন সব পরিষ্কার করে ফেলে! অনেকটা ঘরের স্প্রিং ক্লিনিংয়ের মতো। এতে আলঝেইমারের ঝুঁকি কমে, ব্রেনের প্রদাহ কমে আর ইনসুলিন সেনসিটিভিটি বাড়ে। সোজা কথায়, আপনি যখন খাচ্ছেন না (AFK বা Away From Keyboard), তখনও আপনার ব্রেন শক্তিশালী হচ্ছে! ২. দাঁত ফ্লস করা! ভাবছেন, এর সাথে ব্রেনের কী সম্পর্ক? আছে, গভীর সম্পর্ক! কেন এটা ব্রেনের জন্য ভালো? দাঁতের ফাঁকে জমে থাকা ব্যাকটেরিয়া শুধু মুখেই থাকে না, রক্তস্রোতে মিশে সোজা ব্রেনে হানা দিতে পারে। মাড়ির রোগ = মস্তিষ্কের রোগ। মাড়ির ইনফেকশন থেকে বের হওয়া প্রদাহ সৃষ্টিকারী যৌগগুলো ব্লাড-ব্রেন ব্যারিয়ার টপকে ব্রেনে ঢুকে নিউরো-ইনফ্লেমেশন তৈরি করে। এমনকি আলঝেইমারের জন্য দায়ী অ্যামাইলয়েড প্ল্যাক তৈরিতেও এই ব্যাকটেরিয়াদের হাত থাকতে পারে! ফ্লসিং করা মানে শুধু দাঁত পরিষ্কার নয়, এটা আপনার ব্রেনের একটা অদৃশ্য ফায়ারওয়াল তৈরি করার মতো, যা ক্ষতিকর আক্রমণ থেকে বাঁচায়। আমি জানি আপনি এখন মিসওয়াক হাতে নেয়ার কথা ভাবছেন। ৩. যারা ডেস্কে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেন, তাদের জন্য এটা মাস্ট! প্রতি ২০ মিনিট অন্তর একটু উঠে দাঁড়ানো বা হালকা নড়াচড়া করা। কেন এটা ব্রেনের জন্য ভালো? একটানা বসে থাকলে ব্রেনের মিডিয়াল টেম্পোরাল লোব (MTL) পাতলা হতে শুরু করে, যা নতুন স্মৃতি তৈরির প্রধান কেন্দ্র। এর ফলে ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ে। উঠে দাঁড়ালে ব্যারোরিসেপ্টর (চাপ সংবেদী কোষ) সক্রিয় হয়, হার্ট ও রক্তনালীগুলো ঠিকঠাক কাজ করে ব্রেনে রক্ত সরবরাহ বাড়ায়। ফলে ব্রেন পায় ভরপুর অক্সিজেন আর গ্লুকোজ। মানুষ চেয়ারের জন্য জন্মায়নি। আমাদের মস্তিষ্ক ঘণ্টার পর ঘণ্টা চেয়ারে বসে থাকার জন্য তৈরি হয়নি! ৪. একা একা ‘সোলো মোডে’ জীবন না কাটিয়ে, দলবদ্ধ কার্যকলাপে অংশ নেওয়া। কেন এটা ব্রেনের জন্য ভালো? ডোপামিন পার্টি! সামাজিক মেলামেশা ব্রেনের হিপোক্যাম্পাস ও প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ অংশে ডোপামিন এবং অন্যান্য নিউরোট্রান্সমিটারের ক্ষরণ বাড়ায়। এগুলো স্মৃতি, আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জরুরি। মুখোমুখি আলাপের জোর- ডিসকর্ডে চ্যাট করার চেয়ে সামনাসামনি আড্ডা বা কাজ করা ব্রেনকে অনেক বেশি সক্রিয় করে। মুখের ভঙ্গি, শারীরিক ভাষা, এসব জটিল বিষয় প্রসেস করতে গিয়ে ব্রেনের দারুণ ব্যায়াম হয়। কগনিটিভ রিজার্ভ। এটাকে বলা যেতে পারে ব্রেনের নিজস্ব ‘ব্যাকআপ প্ল্যান’। যত বেশি সামাজিক হবেন, এই রিজার্ভ তত বাড়বে, যা বয়সকালে ব্রেনকে সতেজ রাখতে সাহায্য করবে। ৫. প্রতিদিন একই রুটিনে না চলে, জীবনে ছোট ছোট নতুন জিনিস যোগ করা। কেন এটা ব্রেনের জন্য ভালো? ব্যবহার করো অথবা হারাও (Use it or lose it)- আমাদের ব্রেন এই নীতিতে চলে। নতুন কিছু শিখলে বা করলে ব্রেনের স্মৃতি কেন্দ্র হিপোক্যাম্পাসে নতুন নিউরাল পথ তৈরি হয়। নতুন কিছু করার উত্তেজনা ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা নতুন তথ্য মনে রাখতে সাহায্য করে। নতুন রাস্তায় বাড়ি ফেরা, অচেনা খাবার চেখে দেখা, বা এমন কোনো দেশের গান শোনা যেখানে কখনো যাননি, এসব ছোট ছোট ‘সাইড কোয়েস্ট’ আপনার ব্রেনের অভিযোজন ক্ষমতা বাড়ায়। ৬. শুধু জিমে গিয়ে ঘাম ঝরানোই সব নয়, প্রতিদিন যথেষ্ট পরিমাণে হাঁটা। কেন এটা ব্রেনের জন্য ভালো? হাঁটাচলা (বিশেষ করে মাঝারি থেকে দ্রুত গতিতে) ব্রেইন-ডিরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর (BDNF) নামক প্রোটিনের মাত্রা বাড়ায়। এই প্রোটিন নিউরনের বৃদ্ধি ও বেঁচে থাকার জন্য জরুরি। আমাদের মস্তিষ্ক চলার সময়ই ভালো চিন্তা করতে পারে, কারণ এভাবেই সে বিবর্তিত হয়েছে। প্রতিদিন ১০,০০০ কদম হাঁটা কোনো মনগড়া লক্ষ্য নয়, এটা আপনার ব্রেনের বেসলাইন পারফরম্যান্স ঠিক রাখার জন্য ‘মিনিমাম ইফেক্টিভ ডোজ’! ৭. চোখের যত্ন মানে মস্তিষ্কেরও যত্ন। যা দেখি, তাই ভাবি! আমাদের ব্রেনের প্রায় ৩০% প্রসেসিং পাওয়ার ভিজ্যুয়াল কর্টেক্স ব্যবহার করে। দৃষ্টিশক্তি কমলে ব্রেনকে ঝাপসা বা বিকৃত সিগন্যাল প্রসেস করতে অতিরিক্ত খাটতে হয়। অনেকটা পুরনো গ্রাফিক্স ড্রাইভার দিয়ে নতুন গেম চালানোর মতো! দৃষ্টির সমস্যা ঠিক করলে শুধু দেখাই ভালো হয় না, ক্ষতিগ্রস্ত নিউরাল পথগুলোও সেরে ওঠে। গবেষণায় দেখা গেছে, যারা চশমা আপডেট করেছেন বা চোখের চিকিৎসা করিয়েছেন, মাত্র তিন মাসেই তাদের কগনিটিভ টেস্টের স্কোর বেড়েছে! ৮. শুধু একটা ভালো অভ্যাস নয়, একাধিক ভালো অভ্যাসকে একসাথে জীবনে নিয়ে আসা। কেন এটা ব্রেনের জন্য ভালো? যখন আপনি একাধিক স্বাস্থ্যকর অভ্যাস (যেমন – সময়মতো খাওয়া, হাঁটা, সামাজিক মেলামেশা, নতুন কিছু শেখা) একসাথে করেন, তখন তাদের উপকারিতা শুধু যোগ হয় না, গুণ হয়ে যায়! আমাদের ব্রেন বিচ্ছিন্ন ছোটখাটো পরিবর্তনে তেমন সাড়া দেয় না, কিন্তু যখন একটা সামগ্রিক ‘সিস্টেম আপগ্রেড’ হয়, তখন সে দারুণভাবে সাড়া দেয়। দেখলেন তো? আপনার মস্তিষ্ককে শাণিত আর সতেজ রাখার জন্য খুব বেশি কিছু করার দরকার নেই। এই ছোট ছোট, সহজ কৌশলগুলো যদি জীবনের অংশ করে নিতে পারেন, তাহলে বয়স বাড়লেও আপনার ব্রেন থাকবে তরতাজা, স্মৃতি থাকবে তীক্ষ্ণ আর মন থাকবে ফুরফুরে! তাই আজই শুরু করুন আপনার ব্রেনের ‘লেভেল আপ’ মিশন।

Previous Post Next Post