ডেসকো প্রিপেইড মিটার


ডেসকো প্রিপেইড মিটারের একটি আপাত সুবিধা হলো, আপনার সঞ্চিত অর্থ ফুরিয়ে গেলেও, জরুরি প্রয়োজনে আরও প্রায় একশত টাকার বিদ্যুৎ ব্যবহার করার সুযোগ থাকে। তবে এই আপাত আশীর্বাদটি আসে এক সতর্কতামূলক ‘পিপ পিপ’ শব্দের অনুষঙ্গে, যা ব্যবহারকারীকে তার ব্যালান্সের অন্তিম অবস্থা সম্পর্কে জানান দেয়। প্রযুক্তিগত এই সুবিধাটুকু আমার হাতের মুঠোয় থাকা সত্ত্বেও, আমি সচেতনভাবেই তা থেকে নিজেকে বিরত রাখি।


এর অন্তরালে রয়েছে এক মানবিক বিবেচনাবোধ। আমাদের আবাসনের নিরাপত্তা প্রহরী, সেই শ্রদ্ধেয় দারোয়ান চাচা, মিটার বোর্ডের নিকটবর্তী স্থানেই তাঁর রাতের বিশ্রামটুকু সারেন। একবার তাঁর দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি কল্পনা করুন: সারা দিনের অক্লান্ত পরিশ্রম, গেটের পাশে অবিরাম দাঁড়িয়ে থাকা, এরপর যখন তিনি শ্রান্ত শরীর এলিয়ে দেন ঘুমের কোলে, তখন ঐ মিটারের তীক্ষ্ণ ‘পিপ পিপ’ ধ্বনি তাঁর কানে কতটা নির্মম অত্যাচার হয়ে বাজে! তাঁর ঘুমের গভীরে সেই যান্ত্রিক শব্দ হয়তো দুঃস্বপ্নের কাঁটার মতো বিঁধে থাকে।


তাই, আমার মিটারে ১০০ টাকার মতো জরুরি ব্যালান্স অবশিষ্ট থাকার আগেই আমি তা রিচার্জ করে নিই। এই কর্মের মাধ্যমে আমি বাহ্যত কোনো দান-খয়রাত করছি না। যে অর্থ আমি মিটারে ভরছি, তা একান্তই আমার নিজের ব্যবহারের জন্য। কিন্তু এই সামান্য সময়ানুবর্তিতার বিনিময়ে আমি প্রতি রাতে একজন পরিশ্রান্ত মানুষের নিরবচ্ছিন্ন ঘুম নিশ্চিত করতে পারছি। আমার এই ছোট পদক্ষেপে, হয়তো সরাসরি কোনো আর্থিক লেনদেন নেই, কিন্তু এর মাধ্যমে আমি অন্যের প্রতি ন্যূনতম শ্রদ্ধাবোধ ও সহানুভূতির এক অদৃশ্য সেতুবন্ধন রচনা করি।


এটি হয়তো প্রচলিত অর্থে কোনো বিশাল ত্যাগ নয়, কিন্তু এখানেই লুকিয়ে আছে এক গভীর দর্শন। আমাদের সামান্যতম আত্মসংযম, অন্যের জীবনে বয়ে আনতে পারে অনাবিল প্রশান্তি। এ শুধু বিদ্যুতের বিল সময়মতো পরিশোধ করা নয়, এ হলো সহানুভূতির এক নীরব প্রকাশ, মানবিকতার এক স্নিগ্ধ দ্যুতি। আমাদের প্রতিটি কাজের, এমনকি আপাতদৃষ্টিতে নগণ্য কাজেরও, পারিপার্শ্বিকতার উপর এক অনস্বীকার্য প্রভাব রয়েছে। এই উপলব্ধিই আমাদের আরও দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল নাগরিকে পরিণত করে।


বস্তুত, সভ্যতার বুনন তো এমনই অসংখ্য অদৃশ্য সুতোর দ্বারাই শক্তিশালী হয়, যেখানে ব্যক্তিগত সুবিধার ঊর্ধ্বে স্থান পায় অপরের প্রতি বিবেচনা, অপরের স্বস্তির প্রতি সম্মান। আমার এই ক্ষুদ্র প্রয়াস হয়তো সেই বৃহৎ চিত্রের একটি অণু মাত্র, কিন্তু প্রতিটি অণুর সমষ্টিতেই তো মহৎ কিছু সৃষ্টি হয়। এ যেন নিজের আরামের চেয়ে অন্যের আরামকে প্রাধান্য দেওয়ার এক নিঃশব্দ অনুশীলন, যা আমাদের আত্মকেন্দ্রিক জগত থেকে বের করে বৃহত্তর মানব সমাজের অংশীদার করে তোলে। 

Previous Post Next Post