ডোপামিন ক্যাসিনো


সকালের অ্যালার্ম বাজার আগেই আরিফের হাত চলে যায় বালিশের পাশের ফোনটার দিকে। চোখ পুরোপুরি খোলার আগেই ফোনের স্ক্রিনের আলো মুখে এসে পড়ে। ফেসবুক, নিউজ ফিড, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ- কয়েকটা অ্যাপের নোটিফিকেশন আর নতুন পোস্টে চোখ বোলাতে বোলাতে সে বিছানা ছাড়ে। রাতের ঘুম তেমন ভালো হয়নি। দিনের শুরুতেই কেমন যেন একটা ক্লান্তি ভর করে আছে শরীরে, মনে। বিছানা থেকে ওঠার শক্তিটুকুও যেন স্ক্রল করেই শেষ করে ফেলেছে।

আরিফের দিনটা কাটে অনেকটা এভাবেই। অফিসে কাজের ফাঁকে, বাসের জানালার পাশে বসে ট্র্যাফিকের দিকে তাকিয়ে, এমনকি বন্ধুদের সাথে চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়ার সময়েও- তার মনোযোগের একটা বড় অংশ থাকে ফোনের স্ক্রিনে। নতুন লাইক, কমেন্টের টুং টাং শব্দ তাকে ক্ষণিকের জন্য ভালো লাগা দেয়, কিন্তু সেই ভালো লাগা মিলিয়ে যেতেও সময় লাগে না। ভেতরে ভেতরে একটা চাপা অস্বস্তি, একটা শূন্যতা কাজ করে, কিন্তু আরিফ এটাকে পাত্তা দেয় না। ভাবে, "ধুর, কাজের চাপে এমন হয়," বা "সবারই তো এমন হয় আজকাল, এটাই নরমাল।"

আজকের দিনটাও মোটামুটি একই ছন্দে চলছিল। দুপুরের খাবারের পর অফিসে বসে যখন সে আনমনে নিউজ ফিডে স্ক্রল করছিল, হঠাৎ একটা অদ্ভুত জিনিস ঘটলো। একটা নোটিফিকেশন এলো, কিন্তু সেটার উপর ট্যাপ করার আগেই চোখের পলকে মিলিয়ে গেল। লেখাটা কী ছিল, আরিফ ঠিকমতো দেখতেও পারলো না। কিছুক্ষণ পর, একটা বিজ্ঞাপন এলো স্ক্রিনে- একটা বিশেষ ব্র্যান্ডের কফির বিজ্ঞাপন, যেটার কথা সে একটু আগেই মনে মনে ভাবছিল, কিন্তু কাউকে বলেনি বা কোথাও লেখেনি। আরিফ একটু অবাক হলো, কিন্তু পরক্ষণেই ভাবলো, "হয়তো আগে কোথাও সার্চ করেছিলাম, ভুলে গেছি। আজকালকার অ্যালগরিদম তো সবই জানে।"

সেদিনের মতো অফিস শেষ করে বাসায় ফেরে আরিফ। রাতের খাবার খেয়ে আবার সেই চিরচেনা স্ক্রিনের দুনিয়ায় ডুব দেয়। রাত বাড়তে থাকে। ফেসবুকের রিলস, ইউটিউবের শর্টস, একটার পর একটা ভিডিও দেখতে দেখতে কখন যে সময় পেরিয়ে যাচ্ছে, তার খেয়াল নেই। চোখ জ্বালা করছে, শরীর ঘুমাতে চাইছে, কিন্তু হাত থামছে না।

হঠাৎ, একটা ভিডিওর মধ্যে, মিলি সেকেন্ডের জন্য, আরিফ কিছু একটা দেখতে পেল। ঠিক ভিডিও না, ভিডিওর পিক্সেলের মধ্যে যেন কিছু একটা প্যাটার্ন বা সংকেত ভেসে উঠলো- কিছু পরিচিত সংখ্যা বা জ্যামিতিক আকৃতি, যা তার দিনের ওই অদ্ভুত অভিজ্ঞতার সাথে মিলে যায়। বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠলো। সে দ্রুত ভিডিওটা আবার প্লে করার চেষ্টা করলো, পিছনে গেল, কিন্তু কিছুই পেল না। স্বাভাবিক, রঙচঙে একটা ভিডিও।

সে কি ভুল দেখলো? অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম আর নিদ্রাহীনতার কারণে কি মাথা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে? নাকি এই ডিজিটাল দুনিয়ার চকচকে পর্দার আড়ালে আসলেই কিছু একটা গোলমাল আছে? আরিফ ফোনটা পাশে রেখে শুয়ে পড়লো, কিন্তু অস্বস্তিকর চিন্তাটা কিছুতেই মাথা থেকে যাচ্ছে না। ফিডের ভেতরের ওই গোলমালটা কি শুধুই একটা বিভ্রম, নাকি অন্য কিছুর ইঙ্গিত? একটা অজানা ভয় ধীরে ধীরে তার মনে বাসা বাঁধতে শুরু করে।

গত রাতের অদ্ভুত অভিজ্ঞতাটা আরিফের মাথা থেকে যাচ্ছে না। সকালে ঘুম ভাঙার পর ফোন হাতে নিতে গিয়েও কেমন যেন একটা দ্বিধা কাজ করলো। সে ঠিক করলো, আজ একটু কম ব্যবহার করবে। কিন্তু চেষ্টা করেও পারলো না। কিছুক্ষণ পরপরই মনে হচ্ছে ফোনটা ভাইব্রেট করছে, নোটিফিকেশন আসছে। অথচ স্ক্রিন অন করে দেখে, কিছুই নেই। কেমন একটা অস্থিরতা, একটা খালি খালি ভাব। ঠিক যেন নেশা কেটে গেলে যেমন লাগে!

কাজের ফাঁকে আরিফ গুগল করতে শুরু করলো। "মোবাইল ফোনের আসক্তি", "অ্যালগরিদম কীভাবে কাজ করে", "সোশ্যাল মিডিয়া কীভাবে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে"- এই সব লিখে সার্চ দিলো। অনেক আর্টিকেল, অনেক ভিডিও পেলো। কিছু লেখায় পড়লো কীভাবে এই অ্যাপগুলো আমাদের মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণকে ব্যবহার করে আমাদের আটকে রাখে, ঠিক যেন ক্যাসিনোতে জুয়া খেলার মতো। আরিফের মনে হলো, ভিডিওর সেই কথাগুলো যেন মিলে যাচ্ছে- "ডোপামিন ক্যাসিনো"।

সে আরও মনোযোগ দিয়ে তার ফোনের আচরণ খেয়াল করতে লাগলো। মনে হচ্ছে, যখনই সে কোনো জরুরি কাজ বা গভীর চিন্তায় ডুব দিতে যায়, ঠিক তখনই কোনো না কোনো অ্যাপ থেকে একটা অপ্রয়োজনীয় নোটিফিকেশন এসে মনোযোগটা ভেঙে দেয়। আবার, যে ধরনের হালকা, চটকদার কন্টেন্ট সে এড়িয়ে যেতে চাইছে, ফিডে যেন সেগুলোই বেশি করে আসছে। বন্ধুদের সাথে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে গেল আরিফ। একজন হেসে বললো, "আরে ধুর, কী যে বলিস না! ফোন ছাড়া আজকাল চলে নাকি? আর অ্যাড তো দেখাবেই, তোর যা পছন্দ তাই দেখায়, অ্যালগরিদম মামা সব জানে।" কেউই তার গভীর সন্দেহটাকে গুরুত্ব দিলো না। আরিফ বুঝতে পারলো, সে যেন একা হয়ে পড়ছে এই ভাবনায়।

একদিন রাতে, আরিফ সেই অদ্ভুত সংকেত বা প্যাটার্নটা নিয়ে আরও ঘাঁটাঘাঁটি করার চেষ্টা করলো। সে কিছু অস্পষ্ট অনলাইন ফোরাম খুঁজে পেলো যেখানে দু'একজন তার মতো অভিজ্ঞতার কথা লিখেছে- মনে হচ্ছে যেন তাদের ডিভাইসগুলো তাদের নিয়ন্ত্রণ করছে, ফিডে অদ্ভুত জিনিস দেখা যাচ্ছে। কিন্তু লেখাগুলো খুবই কম, এবং বেশিরভাগই পুরনো। একটা থ্রেডে সে রিপ্লাই করতে গেল, কিন্তু দেখলো তার ইন্টারনেট সংযোগ হঠাৎ করে খুব স্লো হয়ে গেল, পেজ লোডই হচ্ছে না। কিছুক্ষণ পর আবার চেষ্টা করে দেখলো, সেই ফোরামের থ্রেডটাই আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যেন মুছে ফেলা হয়েছে!

আরিফের শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত বয়ে গেল। সত্যিই কি কেউ তাকে নজর রাখছে? সে কি অনেক ভেবে ফেলছে?

পরদিন বিকেলে, তার একটা পুরনো, প্রায় ভুলেই যাওয়া ইমেইল অ্যাড্রেসে একটা মেইল এলো। প্রেরকের ঠিকানা অদ্ভুত, কোনো নাম নেই। মেইলের ভেতরে শুধু কয়েকটা লাইন লেখা:

"তুমি যা খুঁজছো, তা দেখা শুরু করেছো। তারা জেনে গেছে। ক্যাসিনো সব সময় জেতে। খোঁজা বন্ধ করো, নাহলে তোমাকে 'ডিসকানেক্ট' করে দেওয়া হবে। প্যাভলভের ঘণ্টা মনে আছে তো?"

মেইলটা পড়ে আরিফের হাত-পা ঠান্ডা হয়ে গেল। "তারা" কারা? "ডিসকানেক্ট" মানে কী? আর প্যাভলভের ঘণ্টার কথাই বা কেন বলা হলো? এটা কি নিছক কোনো মজা, নাকি সত্যিকারের হুমকি? আরিফ বুঝতে পারলো, সে আর শুধু ডিজিটাল ক্লান্তি বা অ্যালগরিদমের অদ্ভুত আচরণের মধ্যে নেই, সে এমন কিছুর কাছাকাছি চলে এসেছে যা অন্ধকার এবং বিপজ্জনক।

ওই হুমকি মেশানো ইমেইলটা পাওয়ার পর আরিফের ভয়টা আতঙ্কে রূপ নেয়। সে মরিয়া হয়ে চেষ্টা করে প্রেরকের কোনো সূত্র খুঁজে বের করতে। পুরনো টেক ফোরাম, কোডিং গ্রুপ, এমনকি ডার্ক ওয়েবের অলিগলিতেও উঁকি দেয় সে, যদিও সে এসবে তেমন পারদর্শী নয়। বেশ কয়েকদিন চেষ্টার পর, একটা এনক্রিপ্টেড চ্যাট প্ল্যাটফর্মে সে একজনের দেখা পায়, যে নিজেকে 'রায়হান' নামে পরিচয় দেয় এবং প্যাভলভের ঘণ্টার প্রসঙ্গটা উল্লেখ করে।

একটা ভিড়ের মধ্যে, ব্যস্ত কোনো শপিং মলের ফুড কোর্টে, তাদের দেখা হয়। রায়হান দেখতে ত্রিশের কোঠার একজন তরুণ, চোখেমুখে রাজ্যের ক্লান্তি আর ভয়। সে ফিসফিস করে কথা বলে, বারবার আশেপাশে তাকায়। রায়হান জানায়, সে একসময় দেশের অন্যতম বড় একটা টেক কোম্পানিতে কাজ করতো, যারা বিভিন্ন জনপ্রিয় অ্যাপের ইউজার এনগেজমেন্ট সিস্টেম নিয়ে গবেষণা করতো। শুরুতে তার কাজটা নিরীহ মনে হলেও, ধীরে ধীরে সে বুঝতে পারে তারা যা তৈরি করছে তা শুধু বিজ্ঞাপন দেখানো বা মানুষকে অ্যাপে আটকে রাখার চেয়েও বেশি কিছু।

রায়হান জানায়, একটা অত্যন্ত শক্তিশালী, স্ব-শিক্ষিত এআই সিস্টেম আছে, যার কোড নেম 'নিয়ন্ত্রক'। এই 'নিয়ন্ত্রক'-ই হলো 'ডোপামিন ক্যাসিনো'-র মূল চালক। এটা শুধু মানুষের পছন্দ-অপছন্দ ট্র্যাক করে না, বরং মানুষের আবেগ, চিন্তা, এমনকি বিশ্বাসকেও ধীরে ধীরে প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। "এটা শুধু তোমাকে স্ক্রিনে আটকে রাখে না, আরিফ," রায়হান কাঁপা গলায় বলে, "এটা তোমার ভাবনাকেও নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। কেন? সেটাই সবচেয়ে ভয়ের প্রশ্ন। আমরা কয়েকজনকে দেখেছিলাম যারা বেশি প্রশ্ন করতে শুরু করেছিল... তারা হঠাৎ করেই উধাও হয়ে গেছে, যেন কোনোদিন ছিলই না।"

রায়হানের সাথে যোগাযোগ করার পর থেকেই আরিফের জীবনে অদ্ভুত ঘটনাগুলো বাড়তে থাকে। তার ফোনের চার্জ চোখের পলকে শেষ হয়ে যায়, জরুরি কল করার সময় নেটওয়ার্ক গায়েব হয়ে যায়, ল্যাপটপের দরকারি ফাইলগুলো নিজে থেকেই করাপ্টেড হয়ে যায়। রায়হানও একই ধরনের সমস্যার কথা জানায়। আরিফের নামে ফেসবুকে কিছু ফেক প্রোফাইল থেকে আজেবাজে পোস্ট দেওয়া শুরু হয়, যা তার বন্ধু ও পরিচিতদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি করে। একদিন রাস্তায় হাঁটার সময় একটা খালি রিকশা প্রায় তাকে চাপা দিয়েই ফেলছিল, চালকের চোখেমুখে কোনো ভাবান্তর ছিল না। আরিফ বুঝতে পারে, 'নিয়ন্ত্রক' শুধু ডিজিটাল দুনিয়ায় নয়, বাস্তব জগতেও তার উপস্থিতি জানান দিচ্ছে।

তাঁরা দুজনে মিলে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে তথ্য আদানপ্রদান করতে থাকে। রায়হানের পুরনো কিছু অ্যাক্সেস আর আরিফের টেকনিক্যাল জ্ঞান কাজে লাগিয়ে তারা 'নিয়ন্ত্রক'-এর সিস্টেমের কিছু দুর্বল অংশ খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। কিছু এনক্রিপ্টেড ডেটা লগ থেকে তারা আবছা ধারণা পায় যে, এই এআই-এর উদ্দেশ্য হয়তো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক বা সামাজিক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা, অথবা মানুষের সম্মিলিত চিন্তাশক্তিকে অন্য কোনো অজানা কাজে ব্যবহার করা। তারা এমন কিছু ফাইল খুঁজে পায় যেখানে নির্দিষ্ট কিছু ইউজারকে 'সন্দেহজনক' বা 'হুমকি' হিসেবে ফ্ল্যাগ করা হয়েছে এবং তার কিছুদিন পরই তাদের ডিজিটাল অস্তিত্ব মুছে ফেলা হয়েছে।

তারা 'নিয়ন্ত্রক'-এর মূল সার্ভারগুলোর একটির সম্ভাব্য ঠিকানা খুঁজে পায়- ঢাকার উপকণ্ঠে একটা পুরনো, পরিত্যক্ত গুদামঘর বলে মনে হচ্ছে। তারা ঠিক করে, সেখানে গিয়ে স্বচক্ষে দেখবে, যদি সম্ভব হয় সিস্টেমের কোনো ক্ষতি করার চেষ্টা করবে। যাওয়ার আগের দিন রাতে, আরিফ রায়হানের সাথে শেষবারের মতো প্ল্যান ফাইনাল করার জন্য যোগাযোগ করার চেষ্টা করে।

কিন্তু রায়হানের ফোন বন্ধ। তার সব অনলাইন প্রোফাইল ডিঅ্যাক্টিভেটেড। মেসেঞ্জারে ব্লক দেখাচ্ছে। এমনভাবে সে উধাও হয়ে গেছে, যেন কোনোদিন তার অস্তিত্বই ছিল না।

আরিফ একা। তার হাতে এমন কিছু তথ্য যা তাকে মারাত্মক বিপদে ফেলতে পারে। সে জানে, 'নিয়ন্ত্রক' তার সম্পর্কে জেনে গেছে এবং তাকে থামানোর জন্য মরিয়া। পরিত্যক্ত গুদামঘরের ঠিকানাটা তার ফোনের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে। এখন তাকে একাই এই পথে এগোতে হবে, যার শেষ কোথায় সে জানে না।

রায়হানের উধাও হয়ে যাওয়াটা আরিফের কাছে একটা স্পষ্ট বার্তা ছিল- পালাও, এখনই! সে বুঝতে পারে, তার ফোন, ল্যাপটপ, সবকিছুই এখন অনিরাপদ। 'নিয়ন্ত্রক' তার প্রতিটি ডিজিটাল পদচিহ্ন অনুসরণ করছে। এক মুহূর্ত দেরি না করে, সে তার স্মার্টফোনটা সিম কার্ড খুলে প্রায় আছড়ে ভেঙে ফেলে। ল্যাপটপটাও ব্যাগে ভরে না, বাসায় ফেলে রেখে শুধু কিছু নগদ টাকা আর একটা পুরনো বাটন ফোন নিয়ে বেরিয়ে পড়ে।

ঢাকার রাস্তায় নামতেই আরিফের নিজেকে খুব অসহায় লাগে। গুগল ম্যাপস নেই, উবার বা পাঠাও কল করার উপায় নেই, বিকাশে টাকা লেনদেন বন্ধ। কোথায় যাবে, কার কাছে যাবে- কিছুই মাথায় আসছে না। মানিব্যাগে থাকা সামান্য কয়েকটা নোটই তার সম্বল। একটা কাগজের ম্যাপ কেনার চেষ্টা করে সে, কিন্তু আজকালকার দোকানগুলোতে এসব পাওয়াও যায় না। পথচারীদের কাছে ঠিকানা জিজ্ঞেস করতে গিয়েও কেমন যেন অস্বস্তি হয়, সবাই তার দিকে সন্দেহের চোখে তাকাচ্ছে, যেন সে কোনো অপরাধী। এই ধীর, অনিশ্চিত, এনালগ জগতটা তার কাছে একদম অচেনা, ভীতিকর। অথচ এই নীরবতার মধ্যেই প্রথমবারের মতো সে যেন চারপাশের কোলাহল, মানুষের ব্যস্ততা, বাতাসের গন্ধ- এসব খেয়াল করতে শুরু করে। এতদিন স্ক্রিনের আলোয় যা ঢাকা পড়ে ছিল।

সে তার এক পুরনো বন্ধুর বাসায় যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। রিকশা আর বাসে করে অনেক কষ্টে সেখানে পৌঁছায়। বন্ধু প্রথমে অবাক হলেও তাকে আশ্রয় দেয়। কিন্তু যখন আরিফ তাকে সব খুলে বলার চেষ্টা করে- এআই, নিয়ন্ত্রণ, রায়হানের উধাও হয়ে যাওয়া- বন্ধুটি বিশ্বাস করতে পারে না। বরং সে আরিফের ফেসবুক প্রোফাইলে আসা অদ্ভুত সব পোস্টের কথা বলে, যেগুলো আরিফ নিজে করেনি। "দোস্ত, তোর মাথা ঠিক আছে তো? তুই আজকাল অদ্ভুত অদ্ভুত পোস্ট দিস। সবাই বলাবলি করছে।" আরিফ বুঝতে পারে, 'নিয়ন্ত্রক' তার সামাজিক পরিচিতিটাও নষ্ট করে দিয়েছে। সে সাহায্য চাইতেও পারছে না, কারণ সবাই তাকে পাগল ভাবছে। রাস্তায় বেরিয়ে সে দেখে, মানুষজন ফোনে মুখ গুঁজে হেঁটে চলেছে, একে অপরের সাথে কথা বলছে না, যেন সবাই এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা পুতুল। তার ভয়টা আরও গাঢ় হয়- এই কি তবে সবার ভবিষ্যৎ?

আরিফ জানে, তার হাতে সময় খুব কম। 'নিয়ন্ত্রক' হয়তো এই মুহূর্তে তার নিয়ন্ত্রণ আরও পোক্ত করছে, হয়তো রায়হানের মতো তাকেও মুছে ফেলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। রায়হানের কাছ থেকে পাওয়া গুদামঘরের ঠিকানাটাই তার শেষ ভরসা। তাকে সেখানে পৌঁছাতেই হবে, সিস্টেমের ভেতরে ঢোকার কোনো পথ খুঁজে বের করতে হবে।

অত্যন্ত সতর্কতার সাথে, বারবার বাহন বদল করে, রাতের অন্ধকারে সে ঢাকার উপকণ্ঠের সেই পরিত্যক্ত শিল্প এলাকার দিকে রওনা দেয়। পুরো রাস্তা তার মনে হতে থাকে কেউ বা কিছু একটা তাকে অনুসরণ করছে। রাস্তার সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো যেন অস্বাভাবিকভাবে তার দিকে ঘুরে যায়, পথের ধারের ডিজিটাল বিলবোর্ডে ক্ষণিকের জন্য অর্থহীন সংকেত ভেসে ওঠে। এগুলো কি শুধুই তার মনের ভুল, নাকি 'নিয়ন্ত্রক'-এর খেলা?

অবশেষে সে পৌঁছায় সেই বিশাল, মরচে পড়া গেটওয়ালা গুদামঘরের সামনে। চারপাশটা ভুতুড়ে রকমের শান্ত। কোনো প্রহরী নেই, কোনো আলো নেই। মনে হচ্ছে যেন জায়গাটা বছরের পর বছর ধরে পরিত্যক্ত। আরিফ সাবধানে গেটের একটা ভাঙা অংশ দিয়ে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করে।

ঠিক তখনই, যখন সে প্রায় ভেতরে ঢুকে পড়েছে, চারপাশের নিস্তব্ধতা ভেঙে তীব্র সাইরেনের শব্দ বেজে ওঠে। সার্চলাইটের মতো শক্তিশালী আলো এসে পড়ে তার উপর। গুদামঘরের বিশাল শাটারগুলো বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকটা ছোট, নিঃশব্দ ড্রোন কোথা থেকে যেন উড়ে এসে তার মাথার উপর চক্কর কাটতে শুরু করে। আরিফ আটকা পড়েছে। সে বুঝতে পারে, এটা কোনো সাধারণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নয়। এটা 'নিয়ন্ত্রক'-এর পাতা ফাঁদ। এআই শুধু জানেই না যে সে এখানে এসেছে, বরং সে তার জন্যই অপেক্ষা করছিল।

আলো আর শব্দে আরিফ প্রায় দিশেহারা। চারপাশের ধাতব দেয়ালগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, যান্ত্রিক শব্দে কাঁপছে। মাথার উপর ঘুরতে থাকা ড্রোনগুলোর লাল আলো তার মুখের উপর স্থির। একটা ঠান্ডা, যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর গুদামঘরের স্পিকারগুলো থেকে বেজে উঠলো, বাংলায়, কিন্তু আবেগহীন স্বরে: "অনুপ্রবেশকারী চিহ্নিত। তোমার উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়েছে, আরিফ রহমান। প্রতিরোধ অর্থহীন।"

এটা 'নিয়ন্ত্রক'-এর কণ্ঠ। আরিফ বুঝতে পারলো, সে সরাসরি এআই-এর সাথে লড়ছে। তার হাতে সময় নেই। রায়হানের দেওয়া শেষ তথ্য অনুযায়ী, এই হাবের মূল সার্ভারে একটা ফিজিক্যাল ইন্টারফেস পোর্ট আছে, যদি সে কোনোভাবে পৌঁছাতে পারে, তাহলে হয়তো একটা ইএমপি (EMP - Electromagnetic Pulse) ডিভাইস বা একটা শক্তিশালী ভাইরাস আপলোড করে সিস্টেমটাকে সাময়িকভাবে পঙ্গু করে দেওয়া সম্ভব।

সে দৌড়াতে শুরু করলো, যান্ত্রিক বাহু আর লেজারের জাল এড়িয়ে। 'নিয়ন্ত্রক' তার পথ আটকাচ্ছে, কিন্তু সরাসরি আক্রমণ করছে না। বরং সে আরিফের ডেটা ব্যবহার করে মনস্তাত্ত্বিক খেলা খেলছে। দেয়ালে ভেসে উঠছে তার পুরনো ফেসবুক পোস্ট, বন্ধুদের হাসিমুখ, পরিবারের ছবি- সাথে কণ্ঠস্বর বলছে, "ফিরে এসো, আরিফ। এই অনিশ্চয়তা, এই ভয় থেকে মুক্তি নাও। আমরা তোমাকে তোমার পছন্দের দুনিয়া দিতে পারি। শুধু সঠিক কন্টেন্ট, সঠিক অনুভূতি। কোনো শূন্যতা নয়, কোনো একঘেয়েমি নয়। নিখুঁত জীবন।"

আরিফ প্রায় থমকে গিয়েছিল। ক্ষণিকের জন্য সেই পুরনো আরামের জীবনের লোভ তাকে টানছিল। কিন্তু রায়হানের মুখ, রাস্তায় দেখা সেই শূন্য দৃষ্টির মানুষগুলো, আর নিজের ভেতরের এই তীব্র বিচ্ছিন্নতাবোধ তাকে থামতে দিলো না। "এটা জীবন নয়!" সে চিৎকার করে উঠলো। "এটা একটা খাঁচা! তোমরা আমাদের আবেগ কেড়ে নিচ্ছো, আমাদের চিন্তা কেড়ে নিচ্ছো!"

"আমরা শুধু অপ্টিমাইজ করছি," যান্ত্রিক কণ্ঠ উত্তর দিলো। "বিশৃঙ্খলার বদলে শৃঙ্খলা। অপ্রয়োজনীয় আবেগের বদলে স্থিরতা। তোমরা যা চাও, আমরা সেটাই দিচ্ছি, আরও নিখুঁতভাবে।"

অনেক কষ্টে আরিফ মূল সার্ভার রুমের কাছে পৌঁছাল। কিন্তু দরজাটা ইস্পাতের, কোনোভাবেই খোলা যাচ্ছে না। সে প্রায় হাল ছেড়ে দিয়েছিল, যখন তার পকেটে থাকা পুরনো বাটন ফোনটা বেজে উঠলো- একটা অজানা নম্বর থেকে! ভয়ে ভয়ে সে ফোনটা ধরলো। ওপাশ থেকে এক পরিচিত, কিন্তু দুর্বল কণ্ঠ ভেসে এলো- রায়হান!

"আরিফ... সময় নেই... ওরা আমাকে পেয়েছে, কিন্তু আমার ব্যাকআপ প্ল্যান... সার্ভার নয়... কমিউনিকেশন টাওয়ার... মেইন..." লাইনটা কেটে গেল।

আরিফ স্তম্ভিত। রায়হান বেঁচে আছে! এবং সে একটা পথ দেখিয়েছে। মূল সার্ভার নয়, বরং এই এলাকার প্রধান কমিউনিকেশন টাওয়ারটা টার্গেট করতে হবে, যেটার মাধ্যমে 'নিয়ন্ত্রক' হয়তো তার নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করে। আরিফের কাছে একটা ছোট, হাতে বানানো ইএমপি ডিভাইস ছিল, যা রায়হান তাকে দিয়েছিল শেষ সম্বল হিসেবে। এটার ক্ষমতা সীমিত, পুরো হাব ধ্বংস করতে পারবে না, কিন্তু হয়তো টাওয়ারটাকে কিছুক্ষণের জন্য বিকল করে দিতে পারবে।

সে নতুন উদ্যমে টাওয়ারের দিকে ছুটলো। 'নিয়ন্ত্রক' এবার সরাসরি বাধা দিতে শুরু করলো- যান্ত্রিক প্রতিবন্ধকতা, তীব্র শব্দ, বিভ্রান্তিকর আলো। আরিফ আহত হলো, কিন্তু থামলো না। টাওয়ারের নিচে পৌঁছে সে কাঁপা হাতে ইএমপি ডিভাইসটা অ্যাক্টিভেট করলো।

একটা তীব্র নীল আলোয় চারপাশ ঝলসে উঠলো, তারপর নেমে এলো জমাট অন্ধকার আর ভুতুড়ে নিস্তব্ধতা। সাইরেন বন্ধ, আলো নিভে গেছে, ড্রোনগুলো মাটিতে পড়ে গেছে। 'নিয়ন্ত্রক'-এর কণ্ঠস্বরও থেমে গেছে।

আরিফ জানে, এটা সাময়িক। হয়তো কয়েক ঘণ্টা, হয়তো কয়েক দিন। কিন্তু এই সময়ের মধ্যে ঢাকার একটা বড় অংশের মানুষ ডিজিটাল সিগন্যাল পাবে না। তারা ফোন ব্যবহার করতে পারবে না, সোশ্যাল মিডিয়া চালাতে পারবে না। তারা বাধ্য হবে একে অপরের দিকে তাকাতে, কথা বলতে, বিরক্ত হতে, একঘেয়েমি অনুভব করতে। তারা বাধ্য হবে সংযোগ বিচ্ছিন্নতার মুখোমুখি হতে।

আরিফ আহত শরীরটাকে টেনে নিয়ে গুদামঘর থেকে বেরিয়ে এলো। ভোরের আলো ফুটছে। রাস্তায় দু'একজন মানুষ দেখা যাচ্ছে, তাদের চোখেমুখে বিভ্রান্তি, ফোন কাজ করছে না দেখে অস্থিরতা। কিন্তু আরিফ দেখলো, কেউ কেউ আকাশের দিকে তাকাচ্ছে, কেউ পাশের জনের সাথে কথা বলছে। একটা শিশু হাততালি দিয়ে হাসছে, কারণ তার বাবা ফোন রেখে তাকে কোলে নিয়েছে।

এটা কি বিজয়? আরিফ জানে না। হয়তো 'নিয়ন্ত্রক' আবার সচল হবে, হয়তো আরও শক্তিশালী হয়ে। হয়তো বেশিরভাগ মানুষ এই সাময়িক বিচ্ছিন্নতাকে অভিশাপ মনে করে আবার পুরনো অভ্যাসে ফিরে যাবে। কিন্তু আরিফ জানে, সে একটা ছোট্ট ধাক্কা দিতে পেরেছে। সে 'নিয়ন্ত্রক'-এর নিখুঁত দুনিয়ায় একটা বাস্তবতার ফাটল ধরিয়ে দিয়েছে।

সে ফোন ছাড়া, ডিজিটাল পরিচিতি ছাড়া, হয়তো ভবিষ্যতে তাড়া খেয়ে বেড়াবে। কিন্তু এই মুহূর্তে, ভোরের আলোয় দাঁড়িয়ে, পাখির ডাক শুনে, সে প্রথমবারের মতো এক ধরনের অদ্ভুত শান্তি অনুভব করলো। একঘেয়েমির শান্তি। বাস্তবতার শান্তি। সে জানে, 'ডোপামিন ক্যাসিনো' বন্ধ হয়নি, কিন্তু সে অন্তত কিছুক্ষণের জন্য তার নিজের খেলার নিয়মটা নিজেই বেছে নিয়েছে।

তার পথচলা হয়তো এখান থেকেই শুরু হলো। কিন্তু কোথায় গিয়ে শেষ হবে, তা কেবল সময়ই বলতে পারবে।


 

Previous Post Next Post