ধনীরা ধনী হচ্ছে, গরিবেরা গরিব- এটা নিয়ে চারদিকে আলোচনার শেষ নেই। সবাই বলছে, “এই তো, দুনিয়াটা দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে।” কিন্তু একটা বিভাজন আছে যেটা নিয়ে কেউ তেমন উচ্চবাচ্য করছে না- শিক্ষিতরা আরও শিক্ষিত হচ্ছে, আর অশিক্ষিতরা আরও গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাচ্ছে।
টেকনোলজি এখন হাতের মুঠোয়। পাঁচ হাজার টাকার ফোনেও ইউটিউব চলে, ফ্রি ক্লাস দেখা যায়, গুগল খোলা যায়।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- কে সেটা ব্যবহার করছে শেখার জন্য?
আমরা অনেক গরিব ছেলেকেই দেখি, তাদের হাতে ফোন আছে, তাতেই সারাদিন রিলস, শর্টস, টিকটক। সময় যাচ্ছে, কিন্তু জীবন বদলাচ্ছে না।
কেউ ওদের শেখায়নি- এই ফোনটা বিনোদনের খেলনা না, এটা তোমার জীবন বদলে দেওয়ার মেশিন হতে পারত।
শিক্ষার অভাব শুধু ক্লাসে না যাওয়ার অভাব না।
শিক্ষার অভাব মানে- জিজ্ঞাসার অভাব, শেখার প্রতি আগ্রহের অভাব, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখার সাহসের অভাব।
আমরা যারা একটু হলেও সুযোগ পেয়েছি, যারা এখনো জানার খিদে ধরে রেখেছি, আমাদের জন্য এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ- এই চুপচাপ বৈষম্যটা চিনে ফেলা।
কারণ একদিন, এই বৈষম্যই আমাদের সমাজকে বিভক্ত করবে, সাইলেন্টভাবে।
জ্ঞান এখনো আলো।
আর অন্ধকারে কেউ যদি বসে থাকে নিজের অজান্তেই, তবে আলোও তার কাছে পৌছায় না- যত কাছেই থাক না কেন।
আমরা যদি পারি, একটা ফোন হাতে থাকা তরুণকে শেখাতে, “দেখ তুই এই রিলস না দেখে একটা ভিডিও ক্লাস দেখ, একদিন তুই নিজেই কাউকে শেখাবি”- তাহলে হয়তো এই নিঃশব্দ বৈষম্যটাও একটু একটু করে বদলাবে।
টেকনোলজি সহজ হয়েছে, ফোন সস্তা হয়েছে, ইউটিউব ফ্রি, বই PDF হয়ে গেছে- তবুও কেন যেন ‘জ্ঞান’ এখনো বহুজনের নাগালের বাইরেই রয়ে গেছে।
একটা সময় ছিল, বই কিনতে টাকা লাগত, টিউশনি করতে হলে ফিজ দিতে হত। এখন ওই একই ফোনে চাইলেই হাজারটা ভিডিও ক্লাস দেখা যায়, ইউটিউব, কোরসেরা, ইউডেমি, খানের একাডেমি- সবই এক ক্লিকে।
তবুও, যে ছেলেটা রিকশাওয়ালার ছেলে, তার কাছে শেখার ইচ্ছেটা কেন জন্মায় না?
সমস্যা টাকায় নয়, সমস্যা টানাটানির মধ্যে জন্ম নেওয়া দৃষ্টিভঙ্গিতে। সমস্যাটা হলো- একজন যখন ছোট থেকে দেখে, "পড়লে লাভ নাই", "চাকরি তো এমনি মিলবে না", তখন তার ভেতরে একটা বিশ্বাস জন্মায়- শিক্ষা আমার জন্য না।
এই বিশ্বাসটাই সবচেয়ে ভয়ংকর গরিবি।
আমরা অর্থনৈতিক দারিদ্র্য মাপতে পারি সংখ্যায়, পরিসংখ্যানে।
কিন্তু শিক্ষাগত দারিদ্র্য অনেক বেশি নিরব, নিঃশব্দ।
এটা ফেসবুক পোস্টে আসে না, নিউজে শিরোনাম হয় না।
একটা সমাজ তখনই ভাঙে, যখন জ্ঞানবিচ্ছিন্ন মানুষগুলো এক সময় বুঝতে পারে, তারা পেছনে পড়ে গেছে- বাট তখন আর ধরার সুযোগ থাকে না।
তখন তারা ক্ষুব্ধ হয়, বিভ্রান্ত হয়, ভুল পথে যায়।
আমরা যারা কিছুটা হলেও শেখার সুযোগ পেয়েছি, তারা কি পারি না, আমাদের চারপাশের অন্ধকারে আলোর একটা ছোট্ট ছিটে ফেলতে?
শিক্ষা যদি একটা আগুন হয়, তাহলে সেই আগুনটা ছড়িয়ে দেওয়াই তো আমাদের কাজ।
