আমাদের প্রায়শই উপদেশ দেওয়া হয়- "অনেক বড় বড় স্বপ্ন দেখো, আকাশের তারাগুলোর পেছনে ছোটো।" এই কথাগুলো নিঃসন্দেহে অনুপ্রেরণাদায়ক। উচ্চাকাঙ্ক্ষা আমাদের এগিয়ে চলার শক্তি জোগায়, নতুন কিছু সৃষ্টি করার উদ্দীপনা দেয়। বড় স্বপ্ন দেখা জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা আমাদের বর্তমান সীমাবদ্ধতাকে অতিক্রম করতে সাহায্য করে। কিন্তু এই স্বপ্ন দেখানোর বহুল প্রচলিত উপদেশের গভীরে কি কোনও ফাঁদ পাতা রয়েছে?
সত্যিই, বড় বড় স্বপ্ন পূরণ করতে করতে দুনিয়া উদ্ধার করে ফেলার যে আহ্বান, তার মধ্যে এক ধরনের মাদকতা আছে। এই উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে এক ধরনের সৌন্দর্যও নিহিত, যা অনেককেই আকর্ষণ করে। তবে এর পেছনে যে সূক্ষ্ম বিপদ লুকিয়ে থাকে, তা আমরা অনেক সময়ই খেয়াল করি না। সেই বিপদটি হলো অবাস্তব প্রত্যাশার চাপ এবং নিজের সক্ষমতা ও পারিপার্শ্বিকতার প্রতি অবজ্ঞা।
প্রথমেই বুঝতে হবে, আপনাকে সব রকমের স্বপ্ন পূরণ করতে হবে না। বরং আপনি সেই স্বপ্নগুলোই লালন করুন এবং পূরণের চেষ্টা করুন, যেগুলো পূরণ করার বাস্তবসম্মত সক্ষমতা আপনার মধ্যে বিদ্যমান। কেবল অন্য একজনকে কোনও একটি নির্দিষ্ট কাজ করতে দেখে বা সাফল্য পেতে দেখে সেই একই পথে হাঁটার সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ নয়। প্রতিটি মানুষের পথচলা, তার সক্ষমতা, তার পারিপার্শ্বিকতা ভিন্ন। আপনার নিজের ভেতরের শক্তি, দুর্বলতা, আপনার পরিস্থিতি এবং সময়ের উপযোগিতা- এই সবকিছু পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা জরুরি। আপনার জীবনের বৃহত্তর উদ্দেশ্যের সাথে সেই স্বপ্নটি কি আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে তবেই স্বপ্নের পেছনে ছোটা উচিত।
এবার আসা যাক আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গে- স্বপ্নের অর্থবহতা। ধরা যাক, আপনার একটি বিশেষ স্বপ্ন পূরণ করার সকল প্রকার সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্নটি কি আপনার জীবনে প্রকৃত আনন্দ বা সন্তুষ্টি এনে দেবে? এমন অনেক স্বপ্ন আছে, যা পূরণ করার পর এক ধরনের শূন্যতা গ্রাস করে। মনে হয়, এত কষ্ট করে যা অর্জন করলাম, তা তো আমাকে সেই কাঙ্ক্ষিত শান্তি বা পূর্ণতা দিল না। এরপর আমি কী করব? এই প্রশ্ন তখন আরও বেশি করে পীড়া দেয়। অনেক সময় দেখা যায়, স্বপ্নের শিখরে পৌঁছে যাওয়ার পরেও মনে হয়, এটা এখনও শেষ হয়নি, মনের মধ্যে এক ধরনের অতৃপ্তি বা হতাশা কাজ করে। এর কারণ হলো, সেই স্বপ্নের সাথে হয়তো আপনার অন্তরের গভীর সংযোগ ছিল না, অথবা সেই স্বপ্নটি ছিল সমাজ বা অন্যের দ্বারা চাপিয়ে দেওয়া।
সুতরাং, স্বপ্ন নির্বাচন এবং তার পূরণের চেষ্টার মধ্যে একটি ভারসাম্য থাকা প্রয়োজন। একদিকে যেমন নিজের সক্ষমতাকে ছাড়িয়ে যাওয়া অবাস্তব স্বপ্নের পেছনে ছোটা অর্থহীন, তেমনই সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অর্থহীন স্বপ্নের পেছনে সময় ও শক্তি ব্যয় করাও জীবনের অপচয়। আমাদের এমন কিছু করতে হবে, যেটার মধ্যে আমরা নিজেদের জন্য অর্থ খুঁজে পাব, যে কাজ আমাদের আত্মিক সন্তুষ্টি দেবে।
তাই, আপনাকে সবকিছু করতে হবে না। বরং আপনি সেই কাজটি করুন, বা সেই স্বপ্নটি পূরণ করুন, যেটিতে আপনি প্রকৃত অর্থ খুঁজে পান এবং যেটি আপনার সাধ্যের মধ্যে অর্জনযোগ্য। এই দুটি বিষয়ের- অর্থাৎ, অর্থবহতা এবং অর্জনযোগ্যতা- একটি সঠিক সমন্বয় প্রয়োজন। যে স্বপ্নের পেছনে ছুটলে আপনার ভেতরের সত্তা সাড়া দেয়, যে কাজ করলে আপনি নিজেকে আরও বেশি করে চিনতে পারেন এবং যে সাফল্য আপনার জীবনে শুধু বাহ্যিক প্রাপ্তি নয়, বরং আত্মিক উন্নতিও নিয়ে আসে, সেটাই আপনার জন্য সঠিক স্বপ্ন।
জীবনের দৌড়ে অন্যের দেখাদেখি নয়, বরং নিজের অন্তরকে শুনুন। ছোট ছোট অর্থপূর্ণ কাজ, যা আপনাকে প্রতিদিন একটু একটু করে এগিয়ে নিয়ে যায় এক গভীর সন্তুষ্টির দিকে, তা অনেক বড় কিন্তু অন্তঃসারশূন্য সাফল্যের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। স্বপ্ন দেখুন, কিন্তু সেই স্বপ্ন হোক আপনার একান্ত আপন, আপনার বাস্তবতার নিরিখে পরীক্ষিত এবং আপনার হৃদয়ের কাছে অর্থবহ। তবেই জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ হয়ে উঠবে সার্থক ও আনন্দময়।
