আমরা সবাই জীবনে সুখী হতে চাই, ভালো থাকতে চাই। যখন দুঃখ আসে, যখন কোনো আঘাত লাগে, তখন আমরা তার থেকে মুক্তি পেতে চাই। বই পড়ি, মোটিভেশনাল ভিডিও দেখি, মেডিটেশন করি- চেষ্টা করি কত কিছুই। কিন্তু অনেক সময় বারবার চেষ্টা করেও কেন যেন সেই একই জায়গায় আটকে যাই, একই কষ্টগুলো, একই হতাশাগুলো বারবার ফিরে আসে। মনে হয় যেন একটা দুষ্টচক্রের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি, যেখান থেকে বেরোবার কোনো পথ নেই।
আসলে মূল কারণটা খুব সহজ, কিন্তু মানতে গেলে অস্বস্তিকর। আমরা অজান্তেই একটা অভ্যাস তৈরি করে ফেলি যা আমাদের নিরাময়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। আমরা সারাক্ষণ আমাদের অতীতের কষ্টের মুহূর্তগুলো, ব্যর্থতাগুলো, অপমানগুলো মনে মনে ফিরিয়ে আনি, সেগুলোকে বারবার বিশ্লেষণ করি।
ধরুন, আপনি রুমের মধ্যে হেঁটে যাচ্ছেন এবং হঠাৎ করে চেয়ারের সাথে আপনার পায়ের আঙুলে খুব জোরে আঘাত লাগল। মুহূর্তের জন্য তীব্র ব্যথা অনুভব করবেন। হয়তো রাগ হবে, বিরক্তি আসবে, পাশে কেউ থাকলে একটু লজ্জাও লাগতে পারে। কিন্তু কিছুক্ষণ পর শারীরিক ব্যথাটা কমে যাবে। আসল ক্ষতটা হয়তো কিছুদিনের মধ্যেই সেরে উঠবে। কিন্তু মনের মধ্যে যে রাগ, বিরক্তি, বা অস্বস্তিটা তৈরি হলো? সেটা হয়তো linger করবে। কেন? কারণ আপনি সেই ঘটনাটাকে বারবার মনে করছেন, মনে মনে দৃশ্যটা ফিরিয়ে আনছেন, সেই সময়ের অনুভূতিগুলোকে আবার বাঁচিয়ে তুলছেন।
আর মজার ব্যাপার হলো, এই ছোট উদাহরণটা শুধু পায়ের আঙুলে আঘাত লাগা নিয়ে নয়। এটা আসলে আমাদের মন কীভাবে মানসিক ব্যথা আর ট্রমার সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া করে, তার একটা উদাহরণ। জীবনের বড় বা ছোট কোনো আঘাত লাগলে, প্রাথমিক কষ্টটা হয়তো সময়ের সাথে সাথে কমে যায়। কিন্তু আমাদের মন সেই ঘটনাটাকে বারবার ফিরিয়ে আনতে থাকে। যেন সেটা একটা চলচ্চিত্র যা বারবার দেখানো হচ্ছে। আর আমরা সেই চলচ্চিত্রের দর্শক হয়ে প্রতিবার একই কষ্ট, একই রাগ, একই দুঃখ অনুভব করি।
এই যে বারবার মনে করার অভ্যাস, এটাকে আমি বলি "অতীতের পুনরাবৃত্তি"। এটা এমন একটা অভ্যাস যার ব্যাপারে আমরা বেশিরভাগ সময়ই সচেতন নই। আর এই অভ্যাসটা না ছাড়লে, নিরাময় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এটা অনেকটা ব্যান্ডেজ খুলে বারবার ঘা খোঁচানোর মতো। যদি বারবার ঘা খোঁচানো হয়, তাহলে সেটা সারবে কীভাবে?
এই পুনরাবৃত্তির পেছনে একটা অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব কাজ করে। আমাদের মন চেনা জিনিস ভালোবাসে। সে যতই কষ্টের হোক না কেন, পরিচিত ব্যথা, পরিচিত হতাশা মনের কাছে অপরিচিত নিরাময় বা পরিবর্তনের চেয়ে বেশি 'নিরাপদ' মনে হয়। কারণ পরিচিত জিনিস অনুমান করা যায়, জানা যায় এরপর কী হবে। কিন্তু নিরাময়ের পথটা অজানা, নতুন, এবং অপ্রত্যাশিত হতে পারে, আর সেটাই মনকে ভয় পাইয়ে দেয়। তাই মন আরামদায়ক অস্বস্তির মধ্যেই থেকে যেতে চায়।
তাহলে এই চক্র ভাঙবেন কীভাবে? কীভাবে অতীতের পুনরাবৃত্তি থেকে বেরিয়ে এসে সত্যি সত্যি নিরাময় শুরু করবেন?
উপায়টা খুব সহজ, কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সচেতন প্রচেষ্টা। এটা হলো আপনার মনোযোগকে মনের তৈরি করা পুরনো গল্পগুলো থেকে সরিয়ে নিয়ে আসা। সেই একই ঘটনা বারবার মনে করা, পুরনো কষ্টগুলো নিয়ে অতিরিক্ত বিশ্লেষণ না করে, মনোযোগকে পুরোটা নিয়ে আসা এই মুহূর্তে, যা সত্যি ঘটছে।
এটা আবেগ চেপে রাখা নয়। আপনার মনে কষ্ট বা রাগ আসতে পারে, সেটা স্বাভাবিক। নিরাময় মানে সেই অনুভূতিগুলোকে স্বীকার করা, তাদের উপস্থিতিকে মেনে নেওয়া, কিন্তু তাদের মধ্যে ডুবে না যাওয়া। তাদের অতিরিক্ত গুরুত্ব না দেওয়া, বা তাদের নিয়ে মনে মনে endless আলোচনা না করা।
মনকে নতুন পথে পরিচালিত করতে হলে তাকে স্পষ্ট নির্দেশ দিতে হবে।
পরের বার যখন মানসিক চাপ অনুভব করবেন, মন যখন অতীতের কোনো ঘটনা বা অনুভূতির দিকে ছুটবে, তখন ৫ সেকেন্ডের জন্য সচেতনভাবে থামুন। তারপর নিজেকে স্পষ্টভাবে বলুন:
"এই চিন্তাটা এখন ঘটছে না। এটা একটা স্মৃতি। এই মুহূর্তে, আমি এখানে আছি। আমি নিরাপদ।"
এই সহজ কথাটা আপনাকে আপনার মনের অতীতের চলচ্চিত্র থেকে বের করে এনে বর্তমানের বাস্তবতায় ফিরিয়ে আনবে। প্রথমদিকে এটা অদ্ভুত বা নিষ্ফল মনে হতে পারে, কিন্তু বারবার অনুশীলনে এটা শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
আরেকটা কার্যকরী উপায় হলো দৈনিক লেখা (journaling)। এটা জীবনের বেশি বিশ্লেষণ করার জন্য নয়, শুধু মনের ভাবনা আর অনুভূতিগুলোকে তাদের সরলতম রূপে কাগজের উপর তুলে ধরা। যখন আপনি আপনার অনুভূতিগুলো লিখবেন, তখন সেগুলো মনের ভেতরের চক্র থেকে বেরিয়ে বাহ্যিক রূপ নেবে। আপনি সেগুলোকে বাইরে থেকে দেখতে পারবেন, যা আপনাকে বিষয়টাকে নতুন চোখে দেখতে সাহায্য করবে এবং সেগুলোকে ছেড়ে দেওয়া সহজ করবে।
মনে রাখবেন, আপনার আবেগগুলো সাময়িক অতিথি। তারা আসে, অল্পক্ষণ থাকে, তারপর চলে যায়। তারা স্থায়ী বাসিন্দা নয়, যদি না আপনি তাদের বারবার মনে এনে স্থায়ী জায়গা দেন।
আপনার অতীত আপনাকে সংজ্ঞায়িত করতে পারে না। আপনার কষ্ট আপনাকে আটকে রাখতে পারে না। আপনার সচেতনতা আপনাকে মুক্ত করতে পারে। কিন্তু এটা কেবল তখনই সম্ভব যখন আপনি সক্রিয়ভাবে, সচেতনভাবে মনোযোগকে অতীতের অন্তহীন পুনরাবৃত্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে আসবেন এবং বর্তমানের জীবনকে আলিঙ্গন করবেন, যা আপনার সামনে উন্মোচিত হচ্ছে।
