আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন?




এক কোলাহলপূর্ণ বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেলের ছোট্ট ঘরটায় বসেছিল জামান। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, কিন্তু জামানের মনের ভেতর তখন কালবৈশাখীর তাণ্ডব। ল্যাপটপের স্ক্রিনে জ্বলজ্বল করছে এক অনলাইন ফোরামের পাতা, যেখানে ধর্ম আর দর্শনের তর্ক চলছে অবিরাম। সেখানেই এক লাইনের একটা প্রশ্ন জামানের চিন্তার জগৎটাকে ওলটপালট করে দিয়েছে- "যদি প্রতিটি সৃষ্টির পেছনে একজন স্রষ্টা থাকেন, তাহলে সেই প্রথম স্রষ্টা, আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন?"
প্রশ্নটা নতুন নয়। আগেও শুনেছে সে, কিন্তু এবারের মতো করে আগে কখনো ভাবায়নি। জামান সাধারণ মুসলিম পরিবারে বেড়ে ওঠা ছেলে। ছোটবেলা থেকে আল্লাহ, রাসূল, কিয়ামত- এসবে বিশ্বাস করেই বড় হয়েছে। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়তো নিয়মিত, কোরআন তেলাওয়াত করতো। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে, বিশেষ করে দর্শন আর বিজ্ঞানের কিছু বই পড়ে, আর বন্ধুদের সাথে নানা তর্কে জড়িয়ে তার সরল বিশ্বাসে চিড় ধরতে শুরু করেছে। যুক্তির কষ্টিপাথরে সবকিছু যাচাই করার এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাকে পেয়ে বসেছে।

আজকের এই প্রশ্নটা যেন সেই আগুনে ঘি ঢেলেছে। যদি সবকিছুরই একটা কারণ বা উৎস থাকতে হয়, তাহলে এই মহাবিশ্বের চূড়ান্ত কারণ যিনি, তার নিজের কারণ কী? তিনি কোথা থেকে এলেন? প্রশ্নটা মাথায় ঘুরপাক খেতেই থাকলো। মনে হলো যেন পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে। এতদিন ধরে যে বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে ছিল, সেটাকেই কেমন যেন নড়বড়ে, ভিত্তিহীন মনে হতে লাগলো।

"আস্তাগফিরুল্লাহ!" জামান বিড়বিড় করে উঠলো। এমন চিন্তা মাথায় আসাটাও যেন পাপ। কিন্তু মনকে সে কিছুতেই বোঝাতে পারছিল না। যুক্তিগুলো সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরছিল তাকে। মাগরিবের আজান ভেসে এলো পাশের মসজিদ থেকে। অভ্যাসবশত উঠে ওযু করে জায়নামাজে দাঁড়ালো জামান। কিন্তু নামাজে দাঁড়িয়েও মন স্থির হলো না। সূরা ফাতিহার আয়াতগুলো মুখে বলছে ঠিকই, কিন্তু অর্থগুলো হৃদয়ে পৌঁছাচ্ছে না। আল্লাহু আকবার বলার সময় মনে হলো, কার উদ্দেশ্যে বলছে সে? সেই সত্তা, যার শুরু নেই, শেষ নেই, যাকে কেউ সৃষ্টি করেনি- এই ধারণাটাকেই এখন কেমন যেন গোলমেলে, স্ববিরোধী মনে হচ্ছে। নামাজ শেষ করে উঠে বসলো সে, কিন্তু মনের অশান্তি কমল না। এক অজানা শূন্যতা গ্রাস করতে লাগলো তাকে।

ইন্টারনেটে অনেক খোঁজাখুঁজি করলো। কিছু প্রচলিত উত্তর পেল- আল্লাহ অনাদি, অনন্ত, তিনি সৃষ্টির ঊর্ধ্বে, তার কোনো স্রষ্টার প্রয়োজন নেই। কিন্তু এই উত্তরগুলো জামানের যুক্তিবাদী মনকে শান্ত করতে পারল না। মনে হলো, এগুলো যেন বিশ্বাসকে টিকিয়ে রাখার জন্য তৈরি করা কথা, যুক্তির ধার ধারে না। তার দরকার ছিল এমন ব্যাখ্যা, যা তার দর্শনের জিজ্ঞাসাকে মেটাতে পারে, যুক্তির দাঁড়িপাল্লায় টেকে।

হঠাৎ তার মনে পড়লো আবিদ সাহেবের কথা। তাদের মহল্লার পুরনো মসজিদের সাবেক ইমাম, এখন অবসরে আছেন। শুধু ধর্মীয় জ্ঞানেই নয়, লোকমুখে শুনেছে তিনি নাকি দর্শন আর যুক্তিবিদ্যাতেও অসাধারণ পাণ্ডিত্য রাখেন। সবচেয়ে বড় কথা, তিনি নাকি তরুণদের প্রশ্ন শুনে বিরক্ত হন না, বরং ধৈর্য ধরে যুক্তি দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন। জামানের মনে হলো, এই জটিল মানসিক অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে হলে আবিদ সাহেবের কাছে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।

কিন্তু ভয়ও লাগলো। একজন হুজুরের কাছে গিয়ে যদি সে বলে বসে, "আল্লাহর অস্তিত্ব নিয়ে আমার মনে সন্দেহ তৈরি হয়েছে, আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে এই প্রশ্ন আমাকে ভাবাচ্ছে"- তিনি কী ভাববেন? তাকে নাস্তিক বা ধর্মত্যাগী ভেবে বসবেন না তো?

অনেক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের পর জামান মনস্থির করলো। এই সংশয়ের বোঝা বয়ে বেড়ানোর চেয়ে মুখোমুখি হওয়াই ভালো। সত্য জানার জন্য প্রশ্ন করতে তো ভয় পেলে চলবে না। কাল সকালেই সে যাবে আবিদ সাহেবের কাছে। নিজের মনের সব দ্বিধা, সব প্রশ্ন তুলে ধরবে তার সামনে। হয়তো তিনিই পারবেন জামানের মনের এই ঘন কালো মেঘ সরিয়ে দিতে, তাকে সঠিক পথের দিশা দিতে। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ল্যাপটপটা বন্ধ করলো জামান। বাইরে বৃষ্টি তখনো পড়ছে, তবে তার মনের ঝড়টা যেন একটু দিক খুঁজে পাওয়ার আশায় শান্ত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।

পরদিন আসরের নামাজের পর জামান কিছুটা দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে আবিদ সাহেবের বাড়ির দরজায় কড়া নাড়ল। দরজা খুললেন আবিদ সাহেব নিজেই। সৌম্য চেহারা, চোখে জ্ঞানের গভীর দীপ্তি, পরনে সাধারণ পায়জামা-পাঞ্জাবি। জামানকে দেখে তিনি মৃদু হাসলেন, যেন আগেই বুঝতে পেরেছেন এই তরুণের মনে কোনো জিজ্ঞাসা ভিড় করেছে।

"আসসালামু আলাইকুম, হুজুর।" জামান সালাম দিলো, গলার স্বরটা একটু কেঁপে গেল।

"ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। এসো বাবা, ভেতরে এসো।" আবিদ সাহেব পরম স্নেহে তাকে বসার ঘরে নিয়ে গেলেন। ঘরটা সাদামাটা, কিন্তু বইয়ের তাকগুলোতে থরে থরে সাজানো বিভিন্ন বই- কোরআন, হাদিস, তাফসিরের পাশাপাশি দর্শন, বিজ্ঞান আর ইতিহাসের বইও চোখে পড়লো জামানের।

কিছুক্ষণ নীরবতার পর জামান ইতস্তত করে বললো, "হুজুর, আমি একটা মানসিক অশান্তি নিয়ে আপনার কাছে এসেছি। কিছু প্রশ্ন আমাকে খুব ভাবাচ্ছে..."

আবিদ সাহেব অভয় দিয়ে বললেন, "বলো বাবা, নির্ভয়ে বলো। মনে প্রশ্ন আসা তো ভালো। জানার আগ্রহ থেকেই তো জ্ঞানের শুরু।"

সাহস পেয়ে জামান তার মনের মূল সংশয়টা তুলে ধরলো, "হুজুর, আমরা বিশ্বাস করি সবকিছুর স্রষ্টা আল্লাহ। কিন্তু... আমার মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছেন? যদি সবকিছুরই কারণ থাকতে হয়..." কথাটা শেষ করতে পারলো না সে, কেমন একটা অপরাধবোধে গলাটা ধরে এলো।

আবিদ সাহেব মনোযোগ দিয়ে শুনলেন। তার চেহারায় বিরক্তি বা রাগের কোনো চিহ্ন দেখা গেল না। তিনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললেন, "খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, বাবা। এই প্রশ্ন অনেক চিন্তাশীল মানুষের মনেই এসেছে। তবে এই প্রশ্নের গভীরে যাওয়ার আগে, চলো আমরা আমাদের চারপাশের জগৎটাকে একটু ভালো করে দেখি, কেমন?"

জামান অবাক হয়ে তাকালো। সে ভেবেছিল হুজুর হয়তো সরাসরি ধর্মগ্রন্থ থেকে কোনো উদ্ধৃতি দেবেন বা তাকে ভর্ৎসনা করবেন। কিন্তু তিনি আলোচনা শুরু করলেন অন্যভাবে।

আবিদ সাহেব বলতে লাগলেন, "তুমি তোমার চারপাশে তাকালেই দেখবে, সবকিছুই প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে, তাই না? এই যে তুমি আজ আমার কাছে এসেছো, কাল হয়তো অন্য কোথাও যাবে। ছোটবেলার তুমি আর আজকের তুমি কি এক? নদীর স্রোত কি কখনো থেমে থাকে? এই যে বাইরের গাছটা, কিছুদিন পর হয়তো এর পাতা ঝরে যাবে, আবার নতুন পাতা গজাবে। ঠিক কিনা?"

জামান মাথা নাড়ল, "জ্বি, হুজুর।"

"দার্শনিকরা এই বদলে যাওয়াটাকেই বলেন 'পরিবর্তন' (Change)। প্রাচীন গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টটল এই পরিবর্তনকে খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি মূলত চার ধরনের পরিবর্তনের কথা বলেছেন।" আবিদ সাহেব ব্যাখ্যা করতে শুরু করলেন, "প্রথমটা হলো সত্তার পরিবর্তন (Change of Substance)। যেমন, একটা বীজ অঙ্কুরিত হয়ে চারাগাছ হয়, সেই চারাগাছ বড় হয়ে পূর্ণাঙ্গ বৃক্ষ হয়, আবার একদিন সেই বৃক্ষ মরে যায়। তোমার আমার জন্ম ও মৃত্যুও এই ধরনের পরিবর্তন।"

"দ্বিতীয়টা হলো গুণের পরিবর্তন (Change of Quality)। যেমন ধরো, কাঁচা আম সবুজ থাকে, পাকলে হলুদ বা লাল হয়ে যায়। পানি ঠান্ডা করলে কঠিন বরফে পরিণত হয়। আবার এই যে তুমি জ্ঞান অর্জন করছো, এটাও তোমার গুণের পরিবর্তন- অজ্ঞতা থেকে জ্ঞানের দিকে যাওয়া।"

"তৃতীয়টি হলো পরিমাণের পরিবর্তন (Change of Quantity)। তুমি ছোট ছিলে, ধীরে ধীরে লম্বা হয়েছ, তোমার ওজন বেড়েছে। আবার ধরো, এক গ্লাস শরবত থেকে কিছুটা খেয়ে ফেললে তার পরিমাণ কমে গেল। এগুলো হলো পরিমাণের পরিবর্তন।"

"আর চতুর্থটা হলো স্থানের পরিবর্তন (Change of Location)। এই যে তুমি তোমার হোস্টেল থেকে হেঁটে আমার বাড়ি এলে, এটা হলো তোমার অবস্থানের পরিবর্তন। যেকোনো নড়াচড়া বা গতিই এই পরিবর্তনের অন্তর্ভুক্ত।"

আবিদ সাহেব থামলেন, জামানের দিকে তাকিয়ে বললেন, "দেখো, আমাদের অভিজ্ঞতার জগৎটা আসলে এইরকম হাজারো পরিবর্তনে ভরপুর। এক মুহূর্তের জন্যও কিছু স্থির থাকছে না। এখন আমার প্রশ্ন হলো, এই যে এত পরিবর্তন দেখছো চারপাশে, এগুলো কেন ঘটে বা কীভাবে ঘটে, ভেবে দেখেছো কি? এই পরিবর্তনগুলোর পেছনে চালিকা শক্তিটা কী?"

জামানের মনে হলো, তার মূল প্রশ্ন থেকে সরে এসেও হুজুর যেন তাকে এক নতুন চিন্তার পথে চালিত করছেন। সে শুধু ভাবছিল স্রষ্টার স্রষ্টা নিয়ে, কিন্তু তার চারপাশের জগতের এই অবিরাম পরিবর্তন নিয়েও তো গভীরভাবে ভাবা দরকার। এই পরিবর্তনগুলোই বা আসছে কোথা থেকে? জামান আবিদ সাহেবের পরবর্তী কথা শোনার জন্য উৎসুক হয়ে রইলো।

আবিদ সাহেব মৃদু হেসে আবার বলতে শুরু করলেন, "আমরা দেখলাম যে আমাদের চারপাশের সবকিছুই সর্বদা পরিবর্তনশীল। অ্যারিস্টটল এই পরিবর্তনকে আরও এক ধাপ গভীরে গিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ ধারণার মাধ্যমে- একটি হলো সম্ভাবনা (Potentiality), অন্যটি হলো বাস্তবতা (Actuality)।"

জামান মনোযোগ দিয়ে শুনছিল। দর্শন ক্লাসে এই শব্দ দুটো শুনেছে সে, কিন্তু এর গভীর অর্থ সেভাবে বোঝা হয়নি।

আবিদ সাহেব একটি মাটির পাত্রে রাখা আমের আঁটি হাতে নিলেন। "এই আঁটিটার দিকে তাকাও, বাবা। এখন এটা একটা আঁটি, তাই না? এটা এর বাস্তব অবস্থা। কিন্তু এর ভেতরে কী লুকিয়ে আছে?"

জামান একটু ভেবে বলল, "একটা আম গাছ।"

"ঠিক বলেছ!" আবিদ সাহেব উৎসাহিত হলেন। "এই আঁটির ভেতরে একটা বিশাল আম গাছে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। উপযুক্ত মাটি, পানি, আলো পেলে এই সম্ভাবনা একদিন বাস্তবে রূপ নেবে, অর্থাৎ একটা সত্যিকারের আম গাছ হবে। তখন 'আম গাছ' হওয়াটা হবে এর নতুন বাস্তবতা।"

তিনি এবার ল্যাপটপের ব্যাগের দিকে ইশারা করলেন। "তোমার এই ব্যাগটা এখন তোমার ল্যাপটপ বহন করার কাজে লাগছে। এটা এর বাস্তব ব্যবহার। কিন্তু এই একই ব্যাগ দিয়ে তুমি বইও বহন করতে পারতে, বা অন্য কিছু। সেই অন্য কাজে ব্যবহারের সম্ভাবনাও এর মধ্যে আছে, যদিও তুমি এখন সেটা করছো না।"

আবিদ সাহেব একটু থামলেন, জামানের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "অ্যারিস্টটলের মতে, পরিবর্তন আর কিছুই নয়, কোনো কিছুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার বাস্তবে রূপ নেওয়া। যা কিছু সম্ভব (Potential), তা যখন অস্তিত্ব লাভ করে (Actual), সেটাই হলো পরিবর্তন। ধরো, এই যে কাঠ," তিনি তার সামনের সেগুন কাঠের নিচু টেবিলটায় হাত রাখলেন, "এটা একসময় ছিল গাছের অংশ। তখন এর মধ্যে চেয়ার, টেবিল বা অন্য আসবাবপত্রে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। কাঠমিস্ত্রি সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়ে এই টেবিলটা বানিয়েছেন।"

জামান এতক্ষণে বিষয়টা ধরতে পারছিল। তার কাছে গরম কফির উদাহরণটা মনে পড়লো। "হুজুর, তাহলে কি গরম কফিটা আসলে 'গরম কফি' হওয়ার পাশাপাশি 'সম্ভাবনাময় ঠান্ডা কফি'?"

"চমৎকার ধরেছ, বাবা!" আবিদ সাহেব খুশি হলেন। "কফিটা যখন গরম, তখন 'গরম' থাকাটা তার বাস্তব অবস্থা (Actuality)। কিন্তু পারিপার্শ্বিকতার কারণে এর ঠান্ডা হয়ে যাওয়ার একটা সহজাত সম্ভাবনা (Potentiality) আছে। যখন কফিটা ঠান্ডা হয়ে যায়, তখন ঠান্ডা হওয়ার সেই সম্ভাবনাটা বাস্তবে (Actuality) রূপান্তরিত হয়। এটাই হলো পরিবর্তন- গরম থেকে ঠান্ডায় পরিবর্তন।"

তিনি আরও যোগ করলেন, "এমনকি তোমার নিজের দিকে তাকাও। ছোটবেলায় তোমার মধ্যে একজন ভালো ছাত্র, ভালো মানুষ, এমনকি একজন ভালো ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তুমি পড়াশোনা করে, চেষ্টা করে সেই সম্ভাবনাগুলোর কোনো একটাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছ বা দিচ্ছো। আবার, একই সাথে তোমার মধ্যে খারাপ কিছু হওয়ার সম্ভাবনাও ছিল, কিন্তু তুমি সেই পথে না গিয়ে ভালো পথে চলেছ। পরিবর্তন মানেই হলো কোনো একটা সম্ভাবনার বিজয়।"

জামান ভাবলো, তাহলে জগতের সবকিছুই আসলে সম্ভাবনা আর বাস্তবতার এক অবিরাম খেলা। যা এখন বাস্তব, তার মধ্যে লুকিয়ে আছে অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনা। আর সেই সম্ভাবনাগুলোই একেক সময় একেক কারণে বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।

"কিন্তু হুজুর," জামান প্রশ্ন করলো, "এই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে রূপ নেয় কীভাবে? আঁটি থেকে গাছ তো এমনি এমনি হয় না, তার জন্য মাটি, পানি লাগে। কাঠ থেকে টেবিলও তো একা একা তৈরি হয় না, কাঠমিস্ত্রি লাগে। তাহলে এই পরিবর্তনের পেছনে কারণটা কী?"

আবিদ সাহেব হাসলেন। "খুব ভালো প্রশ্ন। তুমি ঠিক পথেই এগোচ্ছো। সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে অবশ্যই একটা চালিকা শক্তি বা কারণ প্রয়োজন, যা নিজে ইতিমধ্যেই বাস্তবে আছে। এবার চলো, আমরা এই কারণের শৃঙ্খল নিয়েই আলোচনা করি।"

জামানের মনে হলো, সে যেন এক অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষে আলোর রেখা দেখতে পাচ্ছে। তার মূল প্রশ্নের উত্তর হয়তো এই কারণের শৃঙ্খলের আলোচনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে। সে গভীর মনোযোগে আবিদ সাহেবের পরবর্তী কথার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো।

"তাহলে আমরা বুঝলাম," আবিদ সাহেব বলতে শুরু করলেন, "যেকোনো পরিবর্তন, অর্থাৎ কোনো সম্ভাবনার বাস্তবে রূপান্তরের জন্য, এমন একটি কারণ প্রয়োজন যা নিজে ইতিমধ্যেই বাস্তব (Actual)। যেমন, ঠান্ডা পানিকে গরম করতে হলে আগুনের (যা ইতিমধ্যেই উত্তপ্ত, অর্থাৎ Actual Heat) প্রয়োজন। আবার ধরো, এই টেবিলটা," তিনি আবার কাঠের টেবিলটায় টোকা দিলেন, "এই টেবিলটা বানানোর জন্য কাঠমিস্ত্রির প্রয়োজন হয়েছে। কাঠমিস্ত্রি নিজে একজন বাস্তব মানুষ, তার জ্ঞান ও দক্ষতাও বাস্তব। তার সেই বাস্তব সত্তা আর দক্ষতাই কাঠের মধ্যে লুকিয়ে থাকা টেবিল হওয়ার সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে।"

জামান মাথা নেড়ে সায় দিলো। বিষয়টা স্পষ্ট হচ্ছিল তার কাছে।

আবিদ সাহেব এবার একটু ঝুঁকে বসলেন, যেন খুব গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলতে যাচ্ছেন। "এখন প্রশ্ন হলো, এই কারণের ধারাটা কোথায় গিয়ে শেষ হবে? ধরো, তোমার হাতে থাকা কলমটা দিয়ে তুমি কাগজে দাগ দিচ্ছো। কাগজের দাগটা হলো ফল (Effect), আর তোমার কলম চালনা হলো কারণ (Cause)। কিন্তু তুমি কলমটা চালাচ্ছো কেন? কারণ তোমার মস্তিষ্ক থেকে সংকেত আসছে। মস্তিষ্ক সংকেত দিচ্ছে কেন? হয়তো তোমার কোনো চিন্তা বা ইচ্ছার কারণে। সেই চিন্তা বা ইচ্ছা আসছে কোথা থেকে?..."

তিনি থামলেন, তারপর ডমিনোর সারি সাজানোর মতো করে বললেন, "বিষয়টা অনেকটা এরকম- একটা ডমিনো তার পরেরটাকে ধাক্কা দেয়, সেটা আবার তার পরেরটাকে। প্রতিটি ডমিনোর পতনের কারণ তার আগের ডমিনোর ধাক্কা। এখন যদি এই ডমিনোর সারি অসীম পর্যন্ত লম্বা হয়, অর্থাৎ পেছনের দিকে যেতে যেতে এর কোনো শুরুই না থাকে, তাহলে কি প্রথম ডমিনোটা কখনো পড়বে? বা পড়ার জন্য ধাক্কাটা আসবে কোথা থেকে?"

জামান কল্পনায় একটা অসীম লম্বা ডমিনোর সারি দেখতে পেল। সে বুঝতে পারল, যদি সারিটার কোনো শুরুই না থাকে, তাহলে ধাক্কা দেওয়ার প্রক্রিয়াটাই শুরু হতে পারবে না।

আবিদ সাহেব যেন জামানের মনের কথাটা বুঝতে পেরেই বললেন, "ঠিক তাই। যদি প্রতিটি কারণের পেছনে আরেকটি কারণ থাকে, এবং সেই কারণের পেছনে আরও একটি- এইভাবে যদি পেছনের দিকে যেতে যেতে কারণের কোনো আদি বা প্রথম কারণই না পাওয়া যায়, তাহলে তো এই কার্যকারণের শৃঙ্খলটাই শুরু হতে পারত না! কোনো কিছুই ঘটত না, কোনো পরিবর্তনই আসত না। এটাকে দার্শনিকরা বলেন 'কারণসমূহের অন্তহীন পশ্চাদগমন' বা Infinite Regress of Causes।"

তিনি জোর দিয়ে বললেন, "অ্যারিস্টটল খুব স্পষ্টভাবে বলেছেন, এবং এটা যৌক্তিকভাবেও সত্য যে, 'There cannot be an infinite regress of causes.' অর্থাৎ, কারণের এই অন্তহীন শৃঙ্খল থাকা সম্ভব নয়। কারণ যদি এটা সম্ভব হতো, তাহলে আমরা আজ যে জগৎ দেখছি, এত পরিবর্তন, এত ঘটনা- এর কিছুই ঘটত না, কিছুই শুরু হতে পারত না।"

জামান ভাবলো, এই বিষয়টা তো সে আগে এভাবে চিন্তা করেনি! যদি আল্লাহকে কেউ সৃষ্টি করে থাকেন, তাহলে সেই স্রষ্টাকে কে সৃষ্টি করলেন? আবার তাকেই বা কে? এভাবে তো পেছনে যেতেই থাকা যায়, যার কোনো শেষ নেই। আর যদি শেষ না-ই থাকে, তাহলে তো আসলে কিছুই শুরু হওয়ার কথা নয়!

"তাহলে হুজুর," জামান কিছুটা উত্তেজিত স্বরে বললো, "এর মানে হলো, অবশ্যই এমন একটা জায়গায় গিয়ে থামতে হবে, যেখানে প্রথম কারণটা আছে? যার নিজের আর কোনো কারণ নেই?"

আবিদ সাহেবের মুখে প্রসন্নতার হাসি ফুটে উঠলো। "একদম ঠিক ধরেছ, বাবা। যেহেতু আমরা বাস্তব জগতে পরিবর্তন এবং কার্যকারণ দেখতে পাচ্ছি, সেহেতু এটা যৌক্তিকভাবেই প্রমাণিত যে, কারণের এই শৃঙ্খল অসীম হতে পারে না। একে অবশ্যই কোনো এক জায়গায় গিয়ে থামতে হবে। এমন একটি প্রথম কারণ বা আদি সত্তা থাকতেই হবে, যা অন্য সকল পরিবর্তন বা ঘটনার কারণ, কিন্তু তার নিজের কোনো কারণ নেই।"

জামানের বুকের ভেতর জমে থাকা সংশয়ের পাথরটা যেন একটু একটু করে গলতে শুরু করলো। সে বুঝতে পারলো, তার প্রাথমিক প্রশ্নটার মধ্যেই একটা যৌক্তিক ভ্রান্তি ছিল। সে এতক্ষণ ধরে শুধু শৃঙ্খলের ভেতরের অংশগুলো নিয়েই ভাবছিল, শৃঙ্খলটার শুরুর কথাটাই ভাবেনি। তার মনে হলো, সে যেন উত্তরের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। সেই প্রথম কারণটি কে বা কেমন, সেটাই এখন তার জানার বিষয়।

"তাহলে আমরা একমত হলাম," আবিদ সাহেব প্রশান্ত গলায় বললেন, "যেহেতু জগতে পরিবর্তন ঘটছে এবং কার্যকারণ ধারা সচল, সেহেতু কারণের অন্তহীন শৃঙ্খল (Infinite Regress) সম্ভব নয়। যৌক্তিকভাবেই এমন একটি প্রথম কারণ বা আদি সত্তার অস্তিত্ব অপরিহার্য, যিনি সকল কারণের কারণ, কিন্তু তিনি নিজে অকারণ (Uncaused)।"

জামানের চোখেমুখে তখন উত্তেজনার সাথে মিশে আছে এক গভীর উপলব্ধি। সে আবিদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে রইলো, যেন সেই আদি সত্তার স্বরূপ জানার জন্য তার সমস্ত সত্তা উন্মুখ।

আবিদ সাহেব বললেন, "অ্যারিস্টটল এই প্রথম কারণকে বলেছেন 'The Unmoved Mover'- অর্থাৎ, এমন এক সত্তা যিনি নিজে নড়েন না বা পরিবর্তিত হন না (Unmoved), কিন্তু অন্য সবকিছুকে গতি বা পরিবর্তন দান করেন (Mover)। কেন তিনি নিজে পরিবর্তিত হন না? কারণ আমরা আগেই দেখেছি, পরিবর্তন মানে হলো কোনো সম্ভাবনার (Potentiality) বাস্তবে (Actuality) রূপ নেওয়া। কিন্তু যিনি প্রথম কারণ, যিনি সবকিছুর উৎস, তার মধ্যে নতুন কিছু হওয়ার বা পরিবর্তিত হওয়ার কোনো অপূর্ণতা বা সম্ভাবনা থাকতে পারে না। তিনি শুরু থেকেই পূর্ণ, তিনি হলেন 'Pure Actuality' বা পরম বাস্তবতা। তার কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই, তিনি কোনো কিছুর দ্বারা প্রভাবিতও হন না।"

আবিদ সাহেব কিছুক্ষণ থামলেন, জামানকে চিন্তা করার সুযোগ দিলেন। তারপর বললেন, "এই যে দার্শনিক যুক্তি দিয়ে আমরা একজন 'Unmoved Mover' বা 'First Cause' বা 'Pure Actuality'র অপরিহার্য অস্তিত্ব খুঁজে পেলাম, এবার মিলিয়ে দেখো তো পবিত্র কোরআনের বাণীর সাথে।"

তিনি শান্ত স্বরে পড়তে লাগলেন,

"কুল হুয়াল্লাহু আহাদ। আল্লাহুস সামাদ। লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ। ওয়ালাম ইয়াকুল লাহু কুফুওয়ান আহাদ।"

(বলো, তিনি আল্লাহ, এক ও অদ্বিতীয়। আল্লাহ অমুখাপেক্ষী। তিনি কাউকে জন্ম দেননি এবং তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি। এবং তাঁর সমতুল্য কেউই নেই।) - সূরা ইখলাস

"দেখো," আবিদ সাহেব ব্যাখ্যা করলেন, "এখানে আল্লাহ নিজেকে কীভাবে পরিচয় দিচ্ছেন? তিনি আহাদ (এক, অদ্বিতীয়)। তিনি আস-সামাদ (অমুখাপেক্ষী)- অর্থাৎ, তার অস্তিত্বের জন্য বা কোনো কিছুর জন্য তিনি কারও উপর নির্ভরশীল নন। তিনিই সেই 'First Cause', যার নিজের কোনো কারণের প্রয়োজন নেই। এরপর বলা হচ্ছে, লাম ইয়ালিদ ওয়ালাম ইউলাদ- তিনি কাউকে জন্ম দেননি, তাঁকেও কেউ জন্ম দেয়নি। অর্থাৎ, তাঁর কোনো শুরু নেই, তিনি কার্যকারণের এই জাগতিক শৃঙ্খলের অংশ নন, তিনি এর ঊর্ধ্বে, তিনি অনাদি ও অনন্ত। তিনিই সেই অকারণ কারণ (Uncaused Cause)। আর শেষ আয়াতে বলা হচ্ছে, ওয়ালাম ইয়াকুল লাহু কুফুওয়ান আহাদ- তাঁর সমতুল্য বা তাঁর মতো আর কিছুই নেই। তিনিই সেই 'Pure Actuality', যার সাথে সৃষ্টির কোনো কিছুর তুলনা চলে না, যিনি অপরিবর্তনীয় ও পূর্ণ।"

জামানের শরীর দিয়ে যেন একটা বিদ্যুতের শিহরণ বয়ে গেল। এতদিন ধরে সে যে আয়াতগুলো শুধু মুখস্থ পড়েছে, আজ যেন প্রথমবারের মতো তার গভীর যৌক্তিক অর্থ উপলব্ধি করতে পারলো। তার মনে হলো, আল্লাহকে কে সৃষ্টি করেছে- এই প্রশ্নটা আসলে আল্লাহর পরিচয় না জানার কারণেই তৈরি হয়। যিনি নিজেই সকল কারণের প্রথম কারণ, যিনি অনাদি, অনন্ত, অমুখাপেক্ষী ও পরম বাস্তবতা- তাঁর আবার স্রষ্টা থাকবেন কীভাবে? প্রশ্নটাই তো অবান্তর!

"তাহলে হুজুর," জামানের কন্ঠস্বরে এখন আর সংশয় নয়, বরং বিস্ময় আর কৃতজ্ঞতা, "যুক্তিবাদ বা দর্শন আসলে বিশ্বাসের বিরোধী নয়?"

"কখনোই না," আবিদ সাহেব স্নেহমাখা চোখে তাকালেন। "সঠিক পথে চালিত হলে যুক্তি আর গভীর চিন্তাই তো মানুষকে সত্যের সন্ধান দেয়, বিশ্বাসকে আরও মজবুত করে। ইসলাম তো জ্ঞানার্জন আর চিন্তাভাবনা করার উপর সবচেয়ে বেশি জোর দিয়েছে। তোমার মনে প্রশ্ন জেগেছে, তুমি উত্তর খুঁজেছ- এটাই তো সঠিক পথ। শুধু খেয়াল রাখতে হবে, আমাদের সীমিত জ্ঞান দিয়ে যেন আমরা অসীম সত্তাকে পুরোপুরি মাপতে না যাই, আবার যুক্তির পথ ছেড়ে যেন অন্ধ বিশ্বাসেও ডুবে না যাই।"

জামান মাথা নিচু করলো। তার মন থেকে সংশয়ের কালো মেঘটা পুরোপুরি কেটে গেছে। সেখানে এখন ফুটে উঠেছে বিশ্বাসের নির্মল আলো, যা যুক্তির আলোয় আরও বেশি উজ্জ্বল। সে বুঝতে পারলো, তার স্রষ্টা শুধু বিশ্বাসের বিষয় নন, তিনি গভীরতম দার্শনিক যুক্তিরও অনিবার্য পরিণতি।

কিছুক্ষণ পর সে উঠে দাঁড়ালো। "জাযাকাল্লাহ খাইরান, হুজুর। আপনি আমার অনেক বড় একটা দ্বিধা দূর করে দিলেন।"

আবিদ সাহেব হাসিমুখে বললেন, "সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর। তুমি আবার এসো, বাবা। যখনই মনে কোনো প্রশ্ন জাগবে, চলে আসবে। আলোচনা করলে জ্ঞান বাড়ে, ঈমান মজবুত হয়।"

জামান সালাম দিয়ে বেরিয়ে এলো। বাইরের বৃষ্টিটা থেমে গেছে, আকাশে মেঘের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে পড়ন্ত বিকেলের সোনালী রোদ। জামানের মনে হলো, তার ভেতরের জগতেও যেন ঠিক এমনই এক আলো এসে পড়েছে, যা তার পথচলার দিশা হয়ে থাকবে। এখন সে আরও আত্মবিশ্বাসের সাথে বলতে পারবে- লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ- আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ, তিনিই সকল অস্তিত্বের মূল কারণ।




Previous Post Next Post