জীবনের উদ্দেশ্য খোঁজার পথে


আমরা কি শুধুই একটি আকস্মিক ঘটনা? নাকি আমাদের অস্তিত্বের পিছনে রয়েছে কোন গভীর উদ্দেশ্য? বিজ্ঞান বলছে আমরা হয়তো একটি আকস্মিক বিবর্তনের ফল। দর্শন বলছে আমাদের নিজেদের উদ্দেশ্য নিজেরাই সৃষ্টি করতে হবে। আর ধর্ম বলছে আমাদের সৃষ্টির পিছনে রয়েছে মহান সৃষ্টিকর্তার একটি সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা।

ইসলামিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য অত্যন্ত পরিষ্কার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেছেন: "আমি জিন ও মানুষকে কেবল আমার ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছি।" এই ইবাদত শুধু নামাজ-রোজা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী চলা এবং তাঁর সৃষ্টির প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা।

যখন আমি ছোট ছিলাম, তখন মনে হতো জীবনের উদ্দেশ্য মানে হল সফল হওয়া, অর্থ উপার্জন করা, সম্মান পাওয়া। কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে বুঝতে পারলাম এসব অর্জন করেও মানুষের মনে একটা শূন্যতা থেকে যায়। কারণ আমাদের আত্মা এসব দিয়ে পরিপূর্ণ হয় না।

আমরা এই বিশাল মহাবিশ্বে কতটুকু? কিন্তু আল্লাহ আমাদের এতটাই গুরুত্ব দিয়েছেন যে তিনি আমাদের জন্য পৃথিবীতে সবকিছু সৃষ্টি করেছেন, আলো-বাতাস দিয়েছেন। আমাদের জন্য রাসূল পাঠিয়েছেন, আমাদের কাছে কিতাব পাঠিয়েছেন। 

আসলে, আমাদের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য হল আমাদের সৃষ্টিকর্তাকে চেনা, তাঁর সাথে সম্পর্ক গড়া, এবং এই পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি হিসাবে ন্যায় ও কল্যাণের পথে চলা। কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, তিনি মানুষকে "খলিফা" হিসাবে সৃষ্টি করেছেন - যার অর্থ পৃথিবীতে তাঁর প্রতিনিধি। আমি কি সেভাবে বাঁচছি যেভাবে আমার সৃষ্টিকর্তা চান? আমি কি আমার চারপাশের মানুষের জীবনে পজিটিভ পরিবর্তন আনছি? আমি কি প্রকৃতিকে রক্ষা করছি? আসলে, আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য শুধু নিজের সুখ-শান্তি খোঁজা নয়। বরং অন্যদের কল্যাণে কাজ করার মাধ্যমে নিজের জীবনকে সার্থক করা। মহানবী (সা.) বলেছেন, "সর্বোত্তম মানুষ সেই যে মানুষের জন্য কল্যাণকর।" 


আমি অনুভব করি যে, যখন আমরা আমাদের ক্ষমতা ও প্রতিভাকে অন্যের কল্যাণে ব্যবহার করি, তখনই আমরা আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূরণ করি। একটি বীজ যেমন গাছে পরিণত হয়ে ফল দেয়, তেমনি আমাদেরও বিকশিত হয়ে ফল দেওয়ার জন্যই সৃষ্টি করা হয়েছে। সেই সাথে, এই জীবন একটি পরীক্ষা। আল্লাহ তায়ালা আমাদের বিভিন্ন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচাই করেন - আমরা কিভাবে প্রতিক্রিয়া জানাই, আমরা কীভাবে সিদ্ধান্ত নেই, আমরা কীভাবে অন্যদের সাথে আচরণ করি। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আমাদের চরিত্র গঠিত হয় এবং আমরা আধ্যাত্মিকভাবে বৃদ্ধি পাই।

আসলে, জীবনের উদ্দেশ্য খোঁজার যাত্রা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এটা একদিনে খুঁজে পাওয়া যায় না। এটি অনেকটা একটি বাগানের মতো, যেখানে আমরা প্রতিদিন পানি দিয়ে, আগাছা তুলে, যত্ন নিয়ে ফসল ফলাই। সময়ের সাথে সাথে আমরা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও গভীর উপলব্ধি লাভ করি। এই পথে হয়তো অনেক বাধা আসবে, হয়তো অনেক সময় আমরা দিশাহারা হয়ে যাব। কিন্তু যখনই আমরা আমাদের সৃষ্টিকর্তার দিকে ফিরে তাকাই, তখনই আবার পথ খুঁজে পাই। কারণ তিনি আমাদের থেকেও ভালো জানেন আমাদের কী প্রয়োজন, আমাদের জন্য কী উত্তম।


Previous Post Next Post