প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আমরা যেভাবে দাঁত মাজি, যেভাবে জামা পরি, যেভাবে রাস্তায় হাঁটি - এ সবকিছুর পেছনে একটা অদৃশ্য নিয়ম কাজ করে। আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি আবেগ, প্রতিটি অনুভূতির পেছনে লুকিয়ে আছে একটা এলগরিদম। একটা প্যাটার্ন, যেটা আমরা নিজেও হয়তো জানি না।
আজ ভাবছিলাম, আমরা কি নিজেদেরকে সত্যিই চিনি? জানি?
তুমি কেন এই মুহূর্তে হাসছো? কেন তুমি কারো কথায় রাগ করে উঠছো? কেন কোন বিশেষ গান শুনলে তোমার চোখে পানি চলে আসে? কেন তুমি সেই মানুষটির প্রতি আকৃষ্ট হলে যে তোমার জন্য ভালো নয়?
আমাদের প্রতিটি আচরণের পেছনে আছে এক গভীর কোড, যা আমাদের অতীতের অভিজ্ঞতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি, জিন এবং অবচেতন মনের গভীরে লুকানো বিশ্বাসের মিশ্রণে তৈরি।
বিজ্ঞানীরা বলেন, আমাদের মস্তিষ্ক প্রতিনিয়ত অসংখ্য ডাটা প্রসেস করে, আমরা যার অধিকাংশই সচেতনভাবে জানি না। আমাদের সুখ-দুঃখ, ভালোবাসা-ঘৃণা, ভয়-সাহস এসবের পেছনে আছে জৈবিক এবং মনস্তাত্ত্বিক প্যাটার্ন। আল্লাহ আমাদের এমন এক জটিল এবং অসাধারণ এলগরিদম দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, যা কোন প্রোগ্রামারই এখনো পর্যন্ত তৈরি করতে পারেনি।
নিজেকে জানার অর্থ হলো নিজের এই এলগরিদমকে বুঝতে শেখা।
সুফি সাধকরা এটাকেই বলতেন "মান আরাফা নাফসাহু ফাকাদ আরাফা রাব্বাহু" - "যে নিজেকে চিনলো, সে তার প্রভুকে চিনলো।"
এই সেলফ-এলগরিদম বোঝার সুবিধা কী?
১. তুমি বুঝতে পারবে কেন তুমি রাগ করো, কেন তুমি ভয় পাও, কেন তুমি অপ্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নাও।
২. তুমি নিজের ডিবাগিং করতে পারবে - তোমার মধ্যে কোন 'বাগ' বা দোষগুলো আছে তা চিহ্নিত করতে এবং সেগুলো দূর করতে।
৩. তুমি নিজের কোডে নতুন ফাংশন যোগ করতে পারবে - নতুন দক্ষতা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি, নতুন মানসিকতা।
আমার জীবনে অনেক পতন-উত্থান দেখেছি। কিছুদিন আগে আমার মনে হতো, আমি জানি না কেন আমি এমন আচরণ করি। হঠাৎ রাগ করে উঠি, অপ্রয়োজনীয় জিনিস কিনি, ভুল মানুষের প্রতি আকৃষ্ট হই, কেন ক্রমাগত সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করতে থাকি যখন আমার পড়াশোনা করা উচিত।
কিন্তু যখন আমি আমার নিজের এলগরিদম বুঝতে শুরু করলাম, আমার পরিবর্তন শুরু হলো। আমি বুঝতে পারলাম:
আমি যখন রাগ করি, সেটা আসলে ভয় থেকে আসে
আমার জিনিস কেনার নেশা আসলে আমার শূন্যতা ভরার চেষ্টা
আমার সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন আসলে কানেকশন খোঁজার প্রচেষ্টা
এই বোঝার পর থেকে, আমি আমার কোডে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছি। এটা সহজ নয়। আমাদের অবচেতন এলগরিদম শক্তিশালী এবং স্থিতিশীল। কিন্তু পরিবর্তন অসম্ভব নয়।
ইমাম গাজ্জালী বলেছেন: "আত্মার প্রকৃত পরিবর্তন হল ধীরে ধীরে, পানির ফোঁটায় পাথর ক্ষয় হওয়ার মতো।"
আমাদের এলগরিদম জটিল কারণ এটা অনেক স্তরে কাজ করে:
১. জৈবিক স্তর: আমাদের হরমোন, নিউরোট্রান্সমিটার, জিন
২. মনস্তাত্ত্বিক স্তর: আমাদের চিন্তা, অনুভূতি, আবেগ
৩. সামাজিক স্তর: আমাদের পরিবার, বন্ধু, সমাজ থেকে শেখা মূল্যবোধ
৪. আধ্যাত্মিক স্তর: আমাদের বিশ্বাস, উদ্দেশ্য, জীবনের অর্থ খোঁজা
"জ্ঞানীদের মধ্যে সর্বাধিক জ্ঞানী সেই, যে নিজেকে সবচেয়ে বেশি জানে।" আমি দেখেছি, যখন আমি নিজের মধ্যে ডুব দিয়ে আমার নিজের এলগরিদমকে অনুসন্ধান করি, তখন আমি আল্লাহর সৃষ্টির অসাধারণত্বকে আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করি। আল্লাহ বলেছেন, তিনি মানুষকে "আহসানে তাকউইম" - সর্বোত্তম গঠনে সৃষ্টি করেছেন। এই সৃষ্টির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল আমাদের নিজেদের পরিবর্তন করার, নিজেদের এলগরিদম সম্পর্কে সচেতন হওয়ার এবং তা পরিবর্তন করার ক্ষমতা। বাইরের দুনিয়া জয় করার আগে, আমাদের নিজেদের জয় করতে হবে। আর সেটা শুরু হয় নিজেকে জানা থেকে, নিজের এলগরিদমকে বুঝা থেকে। নিজের এলগরিদমকে জানা মানে নিজের জীবনের প্রোগ্রামার হয়ে ওঠা। আর তখনই তুমি সত্যিকারের স্বাধীনতা অনুভব করবে।
