এটা কি স্বপ্ন নাকি বাস্তব?


মাঝে মাঝে আমরা ঘুমের মধ্যে এমন সব অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হই, যা বাস্তবতার চেয়েও বেশি বাস্তব বলে মনে হয়। স্বপ্নের ঘোরেই আমরা নিজেকে চিমটি কাটি, তীব্র ব্যথাও অনুভব করি, খাবার খেয়ে টেস্ট লাগে, পেট ভরে যায়, আর নিশ্চিত হয়ে বলি- এ কিছুতেই স্বপ্ন হতে পারে না, এ তো জীবন্ত বাস্তব! সেই অলীক জগতে আমাদের বছরের পর বছর কেটে যায়। আমরা সেখানে স্মৃতি তৈরি করি, সেই কল্পিত অতীতের স্মৃতিচারণ করি, বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নিই সেইসব অনুভূতির কথা, যা আদতে আমাদের মনগড়া। একবার আমি স্বপ্নে দেখি আমি একটা গেমের ক্যারেক্টার। আমি রাস্তায় হেঁটে বেড়াচ্ছি আর কয়েন সংগ্রহ করছি। আমার পুরোপুরি মনে হচ্ছিল এটাই জীবন। মানুষ হওয়ার যে ব্যাপারটা আছে, সেটা আমার চিন্তাতেই নেই, আমি একজন গেমের ক্যারেক্টার। তারপর সহসা ঘুম ভাঙে, আর দেখি আমি আমার পরিচিত বিছানায়, চারপাশের চেনা জগৎ। অনেক সময় এই অভিজ্ঞতার জাল আরও জটিল হয়ে ওঠে; আমরা স্বপ্নের ভেতরেও ঘুমিয়ে পড়ি এবং সেই ঘুমের ভেতরে বুনে চলি আরও এক নতুন স্বপ্নের জাল- এক অন্তহীন আয়নার প্রতিবিম্বের মতো।

এই মুহূর্তে আপনি যে এই লেখাটি পড়ছেন, আপনি কি সম্পূর্ণ নিশ্চিত যে এটি বাস্তব, স্বপ্ন নয়? আপনার চেতনার এই বর্তমান স্তরটিই কি চূড়ান্ত সত্য? হাতে চিমটি কেটে দেখুন, হয়তো ব্যথাও পাবেন। কিন্তু কে জানে, এই ব্যথা, এই অনুভূতি, এই পাঠ- সবকিছুই হয়তো অন্য কোনো গভীরতর ঘুমের অংশ। যখন সেই ঘুম ভাঙবে, তখন এই মুহূর্তের বাস্তবতা মিলিয়ে যাবে ভোরের কুয়াশার মতো। আপনি এখানে যা যা পড়েছেন, যা যা অনুভব করেছেন, তার বিন্দুমাত্রও হয়তো মনে করতে পারবেন না। এক পলকে সব বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাবে, ঠিক যেমন ঘুম ভাঙলে আগের রাতের জটিল স্বপ্নগুলো মিলিয়ে যায়।

এভাবেই একদিন, জীবনের এই দীর্ঘ স্বপ্ন ভেঙে যখন অকস্মাৎ জেগে উঠবেন, হয়তো দেখবেন আপনি হাশরের ময়দানে দাঁড়িয়ে। জীবনটাও কি তবে এমনই এক দীর্ঘ, জটিল স্বপ্নযাত্রা? যেখানে সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না, অর্জন-বিসর্জন সবই এক মায়ার খেলা? আপনার কি সত্যিই একটি রক্ত-মাংসের শরীর আছে, যার অস্তিত্ব কঠিন বাস্তবতার উপর নির্ভরশীল? নাকি এই পুরো অস্তিত্বটাই এক গভীর চিন্তা, এক অসীম ভাবনা, এক মায়াবী বিভ্রম, যা কোনো এক পরম সত্তার চেতনায় ভেসে বেড়াচ্ছে? আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি কী- বস্তু, নাকি চেতনা? এই প্রশ্নগুলো আমাদের তাড়া করে ফেরে, যখন স্বপ্নের জগৎ আর বাস্তবতার জগৎ মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়।
Previous Post Next Post