এই সময়ে কি আপনারও মাঝে মাঝে মনে হয় মাথার ভেতরটা কেমন যেন ভোঁতা হয়ে আসছে? সকাল বেলা ঘুম ভাঙতেই কি দাঁত ব্রাশ করার আগে ফোনটা আগে হাতে চলে আসে? স্ক্রিন টাইম কি ডাবল ডিজিটে পৌঁছেছে? ফোন পকেটে না থাকলেই কি অস্থির লাগে? ঘণ্টার পর ঘণ্টা সোশ্যাল মিডিয়া বা ভিডিও প্ল্যাটফর্মে স্ক্রল করে কাটিয়ে দেন, অথচ ঘর অগোছালো? মনে হয় যেন জীবনটা বাইরে থেকে দেখছেন, ধীরে ধীরে সব ভেঙে যাচ্ছে, আর আপনি থামাতে পারছেন না? ঠিক যেন স্লো মোশনে ঘটে যাওয়া কোনো গাড়ি দুর্ঘটনা, যার উপর আপনার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, আপনি শুধুই একজন দর্শক?
যদি এমন হয়, তাহলে আপনার 'ব্রেইন রট' (Brain Rot) হয়ে থাকতে পারে। আর চিন্তা করবেন না, আপনি একা নন। এটি এমন একটি অবস্থা যা আপনার চারপাশের প্রায় প্রতিটি মানুষ, তরুণ এবং বৃদ্ধ, সবাইকেই প্রভাবিত করছে। আপনার ঘুম, খাদ্যাভ্যাস বা নিজের ন্যূনতম যত্ন না নেওয়ার মতো অনেক কারণ এর জন্য দায়ী হতে পারে, কিন্তু সবচেয়ে বড় কারণ হলো- হ্যাঁ, আপনি ঠিকই ধরেছেন- ইন্টারনেট।
সারা পৃথিবীতে ৫ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ প্রতিদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আর প্রতিদিন গড়ে প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টার বেশি সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাটায়। এই সংখ্যাটা চমকে দেওয়ার মতো! হিসেব করলে দাঁড়ায়- আমরা সম্মিলিতভাবে প্রতিদিন ৪০ লক্ষ বছরেরও বেশি সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাটাই। বিশ বছর বয়সী একজন মানুষ তার জীবনের প্রায় ষোল বছর স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে কাটাবে। আর দুঃখজনক হলো, এই সময়ের বেশিরভাগই কিন্তু আপনার জীবনে কোনো মূল্য যোগ করে না। শুধু আপনার মস্তিষ্ককে পচিয়ে দেয়।
আসুন 'বুলশিট' (Bullshit) বলতে কী বোঝায়, তার একটা সংজ্ঞা দেওয়া যাক। অনেকে যখন 'ব্রেইন রট'-এর কথা বলেন, তারা সাধারণত আজাইরা মিম বা ফেসবুকের অদ্ভুত পোস্টগুলো বোঝান। হ্যাঁ, সেগুলো অবশ্যই বুলশিট। কিন্তু আমি এটাকে আরেকটু বড় পরিসরে দেখতে চাই। যেকোনো কন্টেন্ট যা আপনার জীবনে ক্ষণস্থায়ী উদ্দীপনা ছাড়া কিছুই যোগ করে না, যা পাঁচ মিনিট পরেই ভুলে যান। এর মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়া, টিভি শো এবং বেশিরভাগ মুভিও পড়ে।
অবশ্যই, মাঝে মাঝে একটু হালকা কন্টেন্ট দেখায় দোষের কিছু নেই। বিনোদন বা উদ্দীপনা আমাদের প্রয়োজন। এটা আমাদের প্রকৃতিরই অংশ, ডিএনএ-তে গাঁথা। পর্যাপ্ত উদ্দীপনা না পেলে আমরা আক্ষরিক অর্থেই পাগল হয়ে যেতে পারি। আপনি যা চান, যখন চান, মুহূর্তেই আপনার মস্তিষ্কে ভালো লাগার অনুভূতি তৈরি করার ক্ষমতা রাখে এই ডিজিটাল জগত। কিন্তু যদি নিজের যত্ন নেওয়ার আগে ফোন খোঁজেন, যদি অস্থিরতা ঢাকতে বা সামান্য বিরক্তি এড়াতে ফোন হাতে চলে আসে, তাহলে সমস্যা আছে।
মজার ব্যাপার হলো, 'ব্রেইন রট' কিন্তু নতুন জিনিস। ইন্টারনেট আর সোশ্যাল মিডিয়া এক দশকের বেশি সময় ধরে আছে, কিন্তু এর প্রভাব এত স্পষ্টভাবে আগে বোঝা যায়নি। কেন এমন হচ্ছে? কারণ, প্রযুক্তি এমন গতিতে এগিয়েছে যা মানব বিবর্তনের গতির সঙ্গে তুলনীয় নয়। হোমো স্যাপিয়েন্স প্রায় তিন লক্ষ বছর ধরে পৃথিবীতে আছে। এই সময়টাকে যদি এক বছর ধরি, তাহলে আমরা চাষ করতে শিখেছি বছরের শেষ দুই সপ্তাহে! রোম শহর তৈরি হয়েছিল মাত্র তিন দিন আগে। প্রথম ইলেকট্রনিক কম্পিউটার এসেছিল এক ঘণ্টা পঁয়তাল্লিশ মিনিট আগে। আর টিকটক এসেছে মাত্র দশ মিনিট আগে! আর অ্যাপল ভিশন প্রো এসেছে মাত্র ৩০ সেকেন্ড আগে!
এই প্রযুক্তিগুলো আমাদের মস্তিষ্কের জন্য খুবই নতুন। কিন্তু যে তাড়না থেকে আমরা এটা করছি, সেটা খুব পুরান- উদ্দীপনার চাহিদা। অতীতে আমাদের বেঁচে থাকার জন্য বা উন্নতির জন্য উদ্দীপনা প্রয়োজন হতো- যেমন শিকার করা, ঘর তৈরি করা, নতুন কিছু শেখা। এই কাজগুলো কঠিন ছিল, কিন্তু ফলপ্রসূ ছিল। আমাদের মস্তিষ্ক সেই অনুযায়ী তৈরি।
কিন্তু এখন কী হয়েছে? স্মার্টফোন আর ইন্টারনেটের কারণে আমাদের জীবনের প্রতিটি সামান্য বিরক্তিকর মুহূর্ত এখন অন্তহীন, ভুলে যাওয়ার মতো কন্টেন্টের স্রোত দিয়ে ভরে গেছে। একঘেয়ে লাগলেই ফোনটা হাতে চলে আসে। আর টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্ম, তাদের অসাধারণ অ্যালগরিদম ব্যবহার করে, আমাদের ঠিক সেই কন্টেন্ট দেখায় যা আমরা চাই, বা যা দেখলে আমাদের মস্তিষ্ক দ্রুত উদ্দীপিত হয়। এটা এত স্মার্ট কারণ এটা আক্ষরিক অর্থেই আপনার জন্য তৈরি। কিন্তু এর ফল কী? আমরা অসাড় হয়ে যাচ্ছি। আমাদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা কমে যাচ্ছে। আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর ধরে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে জীবন নষ্ট করছি, আর সেটা মজারও লাগছে না। শুধুমাত্র একটুখানি ডোপামিনের জন্য এই অন্তহীন অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছি।
এটা একটা ফাঁদ। একটা অন্তহীন ইঁদুর দৌড়। আমরা জীবনের গুরুত্বপূর্ণ জিনিসগুলো উপেক্ষা করছি। নিজের স্বাস্থ্য, সম্পর্ক, লক্ষ্য, স্বপ্ন- সবকিছুর ওপরে জায়গা করে নিয়েছে এই স্ক্রলিং। আমরা জানি এটা খারাপ, কিন্তু তবুও করছি। কেন? কারণ এটা সহজ। কারণ এটা তাৎক্ষণিক তৃপ্তি দেয়। কারণ এটা আমাদের বাস্তব জীবনের কষ্ট বা বিরক্তি থেকে মুক্তি দেয়।
আপনার ব্রেইন রট সারানোর জন্য যেটা কাজ করেছিল, তা হলো স্পষ্ট জিনিসগুলো করা। ফোন থেকে দূরে থাকা, ব্যায়াম করা, পড়ালেখা করা, সৃষ্টিশীল কিছু করা, বই পড়া, বাস্তব জীবনে সময় কাটানো। কিন্তু কঠিন হলো- এটা বাস্তবে করে দেখা। অভ্যাস ভেঙে নতুন অভ্যাস তৈরি করা। প্রথম দিকে খুব বোরিং লাগবে। খুব একঘেয়ে লাগবে। কিন্তু এটাই বিকল্প। এটাই আমাদের মস্তিষ্কের জন্য স্বাভাবিক।
স্ক্রলিং আপনাকে কিছুই দেবে না। কোনো দক্ষতা নয়, কোনো জ্ঞান নয় (অধিকাংশ ক্ষেত্রে), কোনো সত্যিকারের সম্পর্ক নয়। শুধু সাময়িক উদ্দীপনা। কিন্তু কিছু তৈরি করার পর যে তৃপ্তি আসে, নিজের হাতে কিছু গড়ার পর যে আনন্দ আসে, তা স্ক্রলিং কখনও দিতে পারবে না। আপনি একটি ভিডিও তৈরি করুন, একটি কবিতা লিখুন, একটি বাগান করুন, একটি নতুন ভাষা শিখুন, শরীরচর্চা করুন- যাই করুন না কেন, যা আপনার জীবনে সত্যিকারের মূল্য যোগ করে, তা করুন।
মনে রাখবেন, আপনার জীবন সীমিত। আপনার অস্তিত্ব চিরকাল থাকবে না। তাই এই সীমিত সময়টা কি আপনি স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নষ্ট করবেন, নাকি নিজের জীবনটা গড়তে ব্যবহার করবেন, তা নিয়ে ভাবতে বসুন।
